জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: শুধু পাঠ্যবইয়ের মুখস্থ বিদ্যা নয়, জরুরি পরিস্থিতিতে কী ভাবে অন্যের জীবন বাঁচানো যায়-- এবার সেই পাঠই সরাসরি ক্লাসরুমে পেতে চলেছে পড়ুয়ারা। হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যের স্বাস্থ্যদফতর (West Bengal Health Department)। রাজ্যের সমস্ত সরকারি, সাহায্যপ্রাপ্ত ও বেসরকারি স্কুলের নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া হবে সিপিআর প্রশিক্ষণ (CPR Training বা Cardiopulmonary Resuscitation)।
বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি সিবিএসই (CBSE), আইসিএসই (ICSE) এবং আইএসসি (ISC) বোর্ডের প্রায় ৩২ লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রীকে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।
ঠিক কী এই সিপিআর? কেন এটি এত জরুরি?
ভারতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার মানুষ হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বা সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে (Sudden Cardiac Arrest) মারা যান। অনেক সময় পথচলতি মানুষ, বাজারে বা খেলার মাঠে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন।
সিপিআর হল এমন এক প্রাথমিক ও জীবনদায়ী কৌশল (Life Saving Skill), যা প্রয়োগ করে হৃদ্যন্ত্র হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলে কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে এলে বুকের ওপর নির্দিষ্ট ছন্দে চাপ দিয়ে মস্তিষ্কে ও শরীরে রক্ত সঞ্চালন সাময়িকভাবে চালু রাখা যায়। অ্যাম্বুল্যান্স বা চিকিৎসক আসার আগেই রোগী যাতে ‘ব্রেন ডেথ’ বা মৃত্যুর কোলে ঢলে না পড়েন, সেই ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ সিপিআর কার্যত সঞ্জীবনীর কাজ করে।
সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে দেখা গিয়েছে, এক ব্যাংককর্মী আচমকা সবজির স্তূপের ওপর জ্ঞান হারিয়ে পড়লে ভিড়ের মধ্যে থেকে এক তরুণ দ্রুত সিপিআর প্রয়োগ করে তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। চিকিৎসকদের মতে, এই কৌশলটি প্রতিটি নাগরিকের জানা থাকা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ কী ভাবে দেওয়া হবে এবং এতে কী শেখানো হবে?
স্বাস্থ্যদফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং পুরো রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
একদিনের নিবিড় ওয়ার্কশপ: পড়ুয়াদের এক দিনের বিশেষ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ (Hands-on Training) দেওয়া হবে।
নির্দিষ্ট পদ্ধতি: বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত ব্যক্তির বুকের মাঝখানে দুই হাতের তালু রেখে মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার দ্রুত গতিতে চাপ (Chest Compression) দিতে হয়। প্রতি ৩০ বার চাপ দেওয়ার পর রোগীর মুখে মুখ লাগিয়ে দু’বার ফুঁ দিয়ে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন (Rescue Breaths) পাঠাতে হয়।
জরুরি যোগাযোগ: শুধু চাপ দেওয়া নয়, রোগীকে কীভাবে সঠিক ভঙ্গিতে শোয়াতে হবে এবং কীভাবে দ্রুত আপৎকালীন স্বাস্থ্যসেবা বা অ্যাম্বুল্যান্সে যোগাযোগ করতে হবে, তাও শেখানো হবে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক মহল?
স্বাস্থ্যদফতরের এই পদক্ষেপকে সার্বিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন চিকিৎসক ও শিক্ষকরা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পরিকল্পনা যা হাজারো মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে এ-ও জানান যে, প্রশিক্ষণ যেন অত্যন্ত নিখুঁত হয়; কারণ ভুল পদ্ধতিতে বুকে চাপ দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
অন্যদিকে বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ জ্যোতির্ময় পালের কথায়, “হার্ট অ্যাটাক, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন বা হার্ট ব্লকের কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ছাড়াও জলে ডুবে যাওয়া, বড় ধরনের পথদুর্ঘটনার ট্রমা বা মানসিক আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে সিপিআর জাদুর মতো কাজ করতে পারে।”
স্কুলস্তর থেকেই সচেতনতার এই বীজ বুনে দিতে পারলে আগামী দিনে বাংলার প্রতিটি ঘরে অন্তত একজন করে প্রশিক্ষিত ‘জীবনরক্ষক’ তৈরি হবে, যা রাজ্যের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এক বড় মাইলফলক হয়ে উঠতে চলেছে।