জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আকাশে তীব্র ঝাঁকুনি, ডানায় বরফ জমে যাওয়ার বিপদবার্তা এবং তার পরেই ককপিট থেকে শেষ আর্তনাদ-- 'আমাদের আর সময় নেই'। আমেরিকার দক্ষিণ ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে হাড়হিম বিমান দুর্ঘটনা। টেক্সাসের অস্টিন থেকে বাহামাগামী একটি ব্যক্তিগত লিয়ারজেট ৬০ (Learjet 60) বিজনেস জেট হঠাৎ মাঝ-আকাশ থেকে খাড়া নিচে নেমে এসে এক ব্যস্ত রাস্তার পাশে আছড়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণে জ্বলন্ত আগুনের গোলায় (Fireball)হয়ে যায়। বিমানে থাকা ৯ জন যাত্রীর সবার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস এই বিপর্যয়কে বর্ণনা করে বলেছেন, 'মনে হচ্ছিল যেন আকাশ থেকে একটি মিসাইল খাড়া নিচে আছড়ে পড়ল'।
ঠিক কী ঘটেছিল অন্তিম মুহূর্তে? (The Final Minutes)
ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) ও প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাহামাসের উদ্দেশে উড়েছিল। ফ্লোরিডার গ্রিন একরস শহরের আকাশে পৌঁছানোর সময় আবহাওয়া খারাপ ছিল।
কন্ট্রোল রুম ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডিং থেকে জানা যায়:
বরফ ও তীব্র টার্বুলেন্স: দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগেই বিমানের পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে (ATC) জানান, তাঁদের বিমানে বরফ জমছে (Icing Conditions) এবং তীব্র টার্বুলেন্সে (Severe Turbulence) ফ্লাইট প্রায় ৭০০ ফুট পর্যন্ত ওঠানামা করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা আরও উঁচুতে ওঠার (Climb) আবেদন করেন।
চরম গতিতে পড়ে যায় (Steep Dive): কিন্তু এর পরেই দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিমান অনিয়ন্ত্রিত উল্লম্ব পতনের (Nosedive) শিকার হয়। সাধারণ অবতরণ নয়, বিমানটি প্রথমে প্রতি মিনিটে ১০,০০০ ফুট এবং পরবর্তীতে প্রতি মিনিটে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ফুট দ্রুততায় নিচে নেমে আসতে থাকে।
মে-ডে কল ও শেষ সংকেত: জরুরি অবস্থা বা 'মে-ডে' (Mayday Call) ঘোষণা করেন পাইলট। ককপিট অডিওর শেষ মুহূর্তের রেকর্ডে শোনা যায় চরম আতঙ্কের কণ্ঠ--'Holy fk, we're out of time'। তারপরেই সংযোগ চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অলৌকিকভাবে রক্ষা পেল লোকালয়, খালি করা হল ৬০০ বাসিন্দাকে
ওই পাম বিচ কাউন্টির গ্রিন একরসের ঘনবসতিপূর্ণ মোবাইল হোম পার্ক ও ব্যস্ত প্রধান সড়কের ঠিক ধার ঘেঁষে মাটিতে ধাক্কা মারে। অভিঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে পিচঢালা রাস্তার পাশে বিশালাকার গর্ত তৈরি হয়।
তবে আশপাশের আবাসিক বাড়িগুলোতে সরাসরি আঘাত না লাগায় ভূমিতে থাকা কোনও সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু বা জখম হওয়ার খবর মেলেনি। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয় প্রশাসন প্রায় ৬০০ জন বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়ে যায় এবং রাস্তাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল লিয়ারজেট ৬০?
বিমান বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মাঝ-আকাশে ডানায় বরফ জমে যাওয়া (Structural Icing) বিমান চালনায় সবচেয়ে মারাত্মক বিপদগুলির অন্যতম:
লিফ্ট নষ্ট হওয়া: ডানায় বরফের স্তর জমলে বিমানের এরোডাইনামিক আকার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে উড়ানের বাতাস ধরে রাখার ক্ষমতা (Lift) কমে যায় এবং বিমান ‘স্টল’ (Stall) করে।
ভারসাম্যহীনতা: তীব্র ঘূর্ণাবর্ত বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়ের (Thunderstorm) কবলে পড়লে বিমানের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে চালকের হাত থেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বেরিয়ে যেতে পারে।
মার্কিন পরিবহন সচিব ও জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা পর্ষদ (NTSB) ইতোমধ্যেই ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (FAA) সঙ্গে নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। ব্ল্যাক বক্স ও ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার উদ্ধার করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে-- এই দুর্ঘটনা কি কেবল প্রতিকূল আবহাওয়া ও যান্ত্রিক ত্রুটির যৌথ পরিণতি, নাকি পাইলটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো আকস্মিক বিপর্যয়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)