জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: অক্টোবরের শেষেই বঙ্গোপসাগরে জন্ম নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়েছিল প্রবল ঘূর্ণিঝড় 'অর্ণব' (Cyclone Arnab)। প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষকে সুরক্ষিত আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে জীবনহানি অনেকটাই ঠেকিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেই ধাক্কা পুরোপুরি সামলানোর আগেই এক সপ্তাহের মধ্যে ফের সক্রিয় বঙ্গোপসাগর। ফের একটি শক্তিশালী সিস্টেম (Weather System) ধেয়ে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও তামিলনাড়ু উপকূলের দিকে। বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে আজ ভোরেই আরও জোরালো রূপ নিয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাঝরাতের পর অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোর ও নরসাপুরের মধ্যবর্তী ওঙ্গোলের কাছাকাছি উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে (Landfall) এই ঝড়। তবে এই ঘূর্ণিঝড় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের কোনও বিপদের আশঙ্কা বা সতর্কতা জারি করা হয়নি। পরিস্থিতির ওপর সবসময় নজর রাখছেন আবহাওয়াবিদরা।
ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি প্রভাব বাংলায় না পড়লেও এর জেরে জলীয় বাষ্প ঢুকে রাজ্যের আবহাওয়ায় কিছুটা বদল আসছে। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে আজ ও আগামীকাল আকাশ মূলত আংশিক মেঘলা থাকবে। মঙ্গলবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের ৯ থেকে ১০ জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বিপর্যয় মোকাবিলায় ভারত এখন আর আগের মতো কেবল দুর্যোগের পর ত্রাণের আশায় বসে থাকে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, বড় কোনও সাইক্লোনের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার আগেই যদি দ্বিতীয় ঝড় আছড়ে পড়ে, তবে টানা সেই আঘাত সহ্য করার মতো ক্ষমতা কি ভারতের পূর্ব উপকূলের রয়েছে?
প্রথম সারির ঢাল 'ডপলার রাডার'
ভারতের উপকূল সুরক্ষায় প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো তার আগাম পূর্বাভাস নেটওয়ার্ক (Early Warning System)। ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD - India Meteorological Department) বঙ্গোপসাগরের গতিবিধি ট্র্যাক করতে পূর্ব উপকূলে বসিয়েছে একাধিক উন্নত ডপলার ওয়েদার রাডার (Doppler Weather Radar - DWR)।
বর্তমানে চেন্নাই, কলকাতা, মছিলিপত্তনম, বিশাখাপত্তনম, পারাদ্বীপ, গোপালপুর, শ্রীহরিকোটা এবং কারাইকাল-- এই আটটি কৌশলগত পয়েন্ট থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইসরোর (ISRO) আবহাওয়া স্যাটেলাইট, স্বয়ংক্রিয় রেইন গজ (Rain Gauge) এবং ওশেন-মনিটরিং সিস্টেম (Ocean-Monitoring System)।
তবে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের নিজস্ব রিপোর্ট অনুসারেই, এখনও উপকূলের বেশ কিছু পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অংশে রাডার কভারেজের ফাঁকফোকর (Radar Gaps) রয়েছে। সেগুলো মেরামত করতে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জসহ মূল ভূখণ্ডে আরও নতুন রাডার বসানোর কাজ চলছে।
রাজ্যভিত্তিক প্রস্তুতি কেমন?
টানা সাইক্লোনের মুখে ভারতের প্রতিটি উপকূলবর্তী রাজ্য তাদের নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে মাঠে নামছে:
অন্ধ্রপ্রদেশ (রিয়েল-টাইম ম্যাপিং): রাজ্য সরকার তৈরি করেছে বিশেষ সাইক্লোন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (Cyclone Information Management System)। অমরাবতীর রিয়েল টাইম গভর্নেন্স সোসাইটি (RTGS) সেন্টারে বসে এক ক্লিকে দেখা যায় ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর, সক্রিয় আশ্রয়শিবির (Shelters) এবং জরুরি বিদ্যুৎ পরিকাঠামো। অর্ণবের সময় প্রায় ২০টি জেলায় ২ হাজারের বেশি আশ্রয়শিবির খুলে ৩০ হাজারের বেশি মাছ ধরার নৌকো নিরাপদে নোঙর করানো সম্ভব হয়েছিল। তবে প্রত্যন্ত কিছু মণ্ডলে এখনও তথ্যের সমন্বয়ে কিছু ঘাটতি দেখা যায়।
ওড়িশা (লাস্ট-মাইল সতর্কবার্তা): ওড়িশার মডেলকে বিশ্বব্যাপী সফল হিসেবে ধরা হয় তাদের 'আর্লি ওয়ার্নিং ডিসেমিনেশন সিস্টেম'-এর (EWDS) জন্য। উপকূলের মাত্র দেড় কিলোমিটারের মধ্যে ১২২টি স্বয়ংক্রিয় সাইরেন টাওয়ার বসানো রয়েছে। সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ধসে গেলেও স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল রেডিও লিঙ্কের মাধ্যমে সমুদ্রতীরের ১,২০০-র বেশি গ্রামে সরাসরি অ্যালার্ট পৌঁছে যায়।
তামিলনাড়ু (শহুরে জলবন্দি সংকট): তামিলনাড়ু ও বিশেষ করে চেন্নাইয়ের বড় মাথা ব্যথা হল ঝড়ের পরের অবিরাম বৃষ্টি এবং শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে তীব্র জলজট (Urban Flooding)। বৃহত্তর চেন্নাই পুরসভা (GCC) ভারী পাম্প ও স্টর্মওয়াটার ড্রেন সংস্কার করে রাখলেও, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস (Storm Surge) আছড়ে পড়লে নগরীর নিকাশি ব্যবস্থা তীব্র চাপের মুখে পড়ে।
আসল পরীক্ষা কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত জাতীয় সাইক্লোন প্রবণতা প্রশমন প্রকল্পের (NCRMP - National Cyclone Risk Mitigation Project) অধীনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বহুস্তরীয় আশ্রয়কেন্দ্র, লবণাক্ত বাঁধ এবং মাটির তলায় বিদ্যুতের তার (Underground Cabling) বসিয়েছে। তাই 'মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো' বা ইভাকুয়েশন (Evacuation) প্রক্রিয়ায় ভারত অনেকটাই সফল।
কিন্তু আসল পরীক্ষা তৈরি হয় পুনরুদ্ধার পর্ব বা 'রিকভারি বিটউইন স্টর্মস' (Recovery between storms)-এ:
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন: প্রথম ঝড়ে বিদ্যুতের খুঁটি বা মোবাইল টাওয়ার উপড়ে গেলে তা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মেরামত না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় ঝড়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।
নষ্ট বাঁধের দুর্বলতা: সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে বাঁধের একাংশ ভেঙে গেলে তা সারানোর আগেই দ্বিতীয় সিস্টেম জল ঢালতে শুরু করলে নোনা জলের বন্যায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নষ্ট হয়।
আশ্রয়শিবিরের রসদ: টানা দুর্যোগে ত্রাণশিবিরে পানীয় জল, ওষুধ ও রেশনের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বড় লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ।
নেপথ্যে কি সমুদ্রের উষ্ণতা?
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগ তো বটেই, সমুদ্রের গভীর স্তরের জলের তাপমাত্রাও (Ocean Heat Content) দ্রুত বাড়ছে। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমফান বা মোচার মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো সমুদ্রের গভীরে জমে থাকা উষ্ণ তাপশক্তি ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অতি-শক্তিশালী সাইক্লোনে (Rapid Intensification) রূপ নিচ্ছে।
ফলে ঝড়ের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে কম-বেশি হলেও, প্রতিটি ঝড়ের ধ্বংসাত্মক তীব্রতা অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
অতএব, ভারতের পূর্ব উপকূলের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল সাইক্লোন আসবে কি না তা জানার নয়। বরং আধুনিক রাডার ও উন্নত প্রযুক্তির ভরসায় মানুষ বাঁচানোর পর--এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় আঘাত এলে বিধ্বস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও জনজীবনকে কত দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।