জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বছরের শুরুর আকাশছোঁয়া রেকর্ড উচ্চতা থেকে প্রায় ২২% থেকে ৩০% দরপতনের হলুদ ধাতুতে। সপ্তাহের শুরুতেই সোনার দামে বিরাট ভূমিকম্প। ভারতীয় বাজারে প্রতি ১০ গ্রাম সোনা যেখানে ১,৭৬,৩০০ টাকা ছুঁয়েছিল, সেখান থেকে নেমে এখন তা ঘোরাফেরা করছে ১,৩৭,০০০ থেকে ১,৩৮,০০০ টাকার কাছাকাছি। বিশ্ববাজারের একাধিক জটিল ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অপরিশোধিত তেলের ওঠানামা এবং মার্কিন নীতি নির্ধারণের প্রেক্ষাপটে সোনার ভবিষ্যৎ গতিবিধি এখন এক রোমাঞ্চকর মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গত দশ মাসে ৫১০০০ টাকা দাম কমেছে। মঙ্গলবার আরও ২০-৩০% দাম কমল। এবার কি ১ লাখের নীচে নামবে?
সাধারণ ক্রেতা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন-- এই দরপতন কি সোনা কেনার মোক্ষম সুযোগ (buying opportunity), নাকি দরপতন এখনও শেষ হয়নি?
দাম কমার আসল কারণ কী?
সোনার দামের এই আকস্মিক পতনের নেপথ্যে কাজ করছে বিশ্ব অর্থনীতির ত্রিফলা সমীকরণ:
১. মার্কিন বন্ড ইল্ড বৃদ্ধি (Rising US Bond Yields): মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়ায় আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের কাছে নন-ইল্ডিং অ্যাসেট (non-yielding asset) অর্থাৎ সুদহীন সোনা রাখার আকর্ষণ কিছুটা ফিকে হয়েছে।
২. ডলার ইনডেক্সের শক্তিবৃদ্ধি (Stronger US Dollar): আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রায় সোনা কেনা আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক চাহিদায় চাপ তৈরি করেছে।
৩. মুনাফা তোলার হিড়িক (Profit Booking): জানুয়ারি মাসে সোনা নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছনোর পর বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড ও বিনিয়োগকারীরা তাদের লাভ নিশ্চিত করতে বিক্রি শুরু করে (profit booking)।
এর সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতি ও অপরিশোধিত তেলের ওঠানামা যুক্ত হয়ে দামকে আরও নিচের দিকে নামিয়েছে।
সস্তা হওয়া মানেই কি আন্ডারভ্যালুড?
শেয়ারের মতো সোনার কোনও পিই রেশিও (P/E ratio), বার্ষিক লাভ বা ডিভিডেন্ড আয়ের মেট্রিক থাকে না। ফলে দাম ২২% পড়েছে বলেই যে সোনা অবিলম্বে সস্তা বা আন্ডারভ্যালুড (undervalued) হয়ে গেছে, এমনটা ভাবা ভুল।
বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক স্পট গোল্ড ৩,৮৫০–৩,৯০০ ডলারের এবং সাময়িকভাবে আরও কিছুটা কারেকশন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এখনই কিনবেন, নাকি আরও কমলে?
বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আপনার আর্থিক লক্ষ্য ও বিনিয়োগের দিগন্তের (investment horizon) ওপর:
এককালীন বড় বিনিয়োগ নয় (Avoid Lump Sum): এখনই সব টাকা সোনায় ঢালা ঝুঁকির হতে পারে। বরং ধীরে ধীরে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (SIP) বা 'বাই অন ডিপস' (Buying on dips) কৌশলে পা ফেলতে পারেন।
পোর্টফোলিও ভারসাম্য (Portfolio Diversification): মোট আর্থিক সঞ্চয়ের ১০% থেকে ১৫%-এর বেশি সোনায় আটকে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। সোনাকে সবসময় মূল্যস্ফীতি বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা ঢাল (hedge against inflation) হিসেবে বিবেচনা করুন।
সোনায় বিনিয়োগের বিকল্প উপায় কী কী?
১. গোল্ড ইটিএফ (Gold ETF)
মূল সুবিধা: স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে সরাসরি রিয়েল-টাইম মূল্যে কেনাবেচা করা যায়। বিশুদ্ধতা নিয়ে কোনও সংশয় থাকে না এবং অলঙ্কারের মতো মেকিং চার্জ, জিএসটি কিংবা লকারে চুরির ঝুঁকি নেই।
যাঁদের জন্য উপযুক্ত: নিয়মিত ট্রেডার এবং আধুনিক ডিজিটাল বিনিয়োগকারী, যাঁরা শেয়ারের মতো স্বচ্ছভাবে সোনার দামের ওঠানামার সুযোগ নিতে চান।
২. সোভেরেন গোল্ড বন্ড (SGB)
মূল সুবিধা: রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) দ্বারা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ইস্যু করা হয়। সোনার বাজারমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বার্ষিক ২.৫০% নিশ্চিত অতিরিক্ত সুদ মেলে। এছাড়া ম্যাচুরিটি পর্যন্ত ধরে রাখলে ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স (মূলধনী লাভ কর) সম্পূর্ণ মকুব হয়।
যাঁদের জন্য উপযুক্ত: দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী (৫ থেকে ৮ বছরের দিগন্ত), যাঁদের তাৎক্ষণিক তারল্যের প্রয়োজন নেই এবং বাড়তি সুদসহ করমুক্ত রিটার্ন চান।
৩. গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড (Gold Mutual Fund)
মূল সুবিধা: বিনিয়োগ করার জন্য কোনও ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ ব্যাংকিং অ্যাপ বা মিউচুয়াল ফান্ড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মাসে মাত্র ১০০ থেকে ৫০০ টাকার সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (SIP) দিয়ে সঞ্চয় শুরু করা যায়।
যাঁদের জন্য উপযুক্ত: একদম নতুন, ছোট সঞ্চয়কারী অথবা যাঁদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট নেই এবং নিয়মিত সঞ্চয়ের সুশৃঙ্খল অভ্যাস তৈরি করতে চান।
৪. ভৌত সোনা বা কয়েন (Physical Gold / Coins)
মূল সুবিধা: বাস্তব স্পর্শযোগ্য সম্পদ (tangible asset), যা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে থাকে। জরুরি সময়ে স্থানীয় বাজারে সরাসরি বিক্রি বা বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার সুবিধা পাওয়া যায়।
যাঁদের জন্য উপযুক্ত: যাঁরা পারিবারিক সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে বা অলঙ্কার তৈরির উদ্দেশ্যে সোনা মজুত করতে চান এবং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তব সম্পদে আস্থা রাখেন।
পড়তি বাজার দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ের পথ তৈরি করে ঠিকই, তবে তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানোই বর্তমান বাজারে সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল।