ভক্তদের কাঁধে নাচছেন ৪৩ ফুটের বামাকালী! মায়াবী রাতে মশালের আগুনে জনসুনামি... ঢাকের বাদ্যিতে মিশল শঙ্খধ্বনি-উলুধ্বনি
রাজপথে ৪৩ ফুটের বামাকালীর নাচ! শান্তিপুরের ঐতিহ্যে মাতল শিলিগুড়ি, জনজোয়ারে সামাল দিতে হিমশিম পুলিস...
নারায়ণ সিংহ রায়: শিলিগুড়ির রাজপথে এ কোন দৃশ্য! এয়ারভিউ মোড় থেকে সফদর হাশমি চক হয়ে সুভাষপল্লী নেতাজি মোড়ে আচমকাই তৈরি হল এক অন্যরকম আবহ। চারদিকে মশালের আগুন, ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল গোটা এলাকা। আর সেই সঙ্গে ভক্তদের কাঁধে চেপে নাচলেন মা বামাকালী! নদিয়ার শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী বামাকালীর নাচের এমন দৃশ্য দেখতে মুহূর্তের মধ্যেই রাজপথে জমে গেল হাজার হাজার মানুষের ভিড়। শুধু বামাকালীর নাচই নয়, শিবকালী গাজন, শিল্পীদের বিভিন্ন কলাকৌশল এবং মশাল শোভাযাত্রায় একেবারে উৎসবের চেহারা নিল শিলিগুড়ির রাজপথ। তবে জনজোয়ারের চাপে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের নির্দেশে নির্ধারিত সময়ের আগেই থামিয়ে দিতে হয় এই বিশেষ আয়োজন।
শিলিগুড়ির সুভাষপল্লীর তরুণ অ্যাথলেটিক ক্লাবের পুজো এই বছর ৬৩ তম বর্ষে। দ্বিতীয়বারের জন্য রাজপথে তুলে ধরা হল নদিয়ার শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী বামাকালীর নাচ। ক্লাবের ৬৩তম বর্ষের শ্যামাপুজোকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ আয়োজন। এবারের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রায় ৪৩ ফুট উচ্চতার মা বামাকালীর প্রতিমা। আর মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় জমার আগেই শহরের রাজপথে এই অভিনব পরিবেশনা ঘিরে তৈরি হয় ব্যাপক উৎসাহ উন্মাদনা। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই এই বিশেষ আয়োজন দেখার জন্য শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে। কুমোরটুলি থেকে মশাল শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় মণ্ডপের উদ্দেশ্যে। ক্লাবের সদস্য, উদ্যোক্তা এবং অসংখ্য ভক্তের অংশগ্রহণে এই শোভাযাত্রা চোখে পরারা মত ।
আরও পড়ুন: ২০০ বছরের ঐতিহ্য! হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির অনন্য নজির ধুমপাড়ার মা বিবিহার কালীপুজো
প্রথমে কুমারটুলি থেকে বেরিয়ে শোভাযাত্রা এগিয়ে চলে এয়ারভিউ মোড়ের দিকে। সেখানে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি এবং শিবকালীর হাজরা নাচের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ। শিল্পীদের বিভিন্ন কলাকৌশল এবং ঠাকুরের গান শোভাযাত্রার আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তোলে। রাত প্রায় ১০টা নাগাদ শোভাযাত্রা এসে পৌঁছয় শহরের অন্যতম ব্যস্ত ভেনাস মোড়, অর্থাৎ সফদর হাশমি চকে। সেখানেই শুরু হয় মূল আকর্ষণ। ঢাকের তালে তালে ভক্তদের কাঁধে তুলে নেওয়া হয় মা বামাকালীর প্রতিমা। এরপর শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী রীতিতে শুরু হয় বামাকালীর নাচ। মশালের আগুনের আলোয় প্রতিমার এই বিশেষ রূপ, ঢাকের তালে তালে ভক্তদের নাচ ও চারপাশের মানুষের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয় গোটা রাজপথ। শহরের রাজপথ যেন পরিণত হয় এক বিশাল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মঞ্চে। পথচলতি মানুষ থেকে শুরু করে দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা, প্রত্যেকেই দাঁড়িয়ে পড়েন এই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে। অনেকেই নিজেদের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করেন সেই মুহূর্ত।
তবে শুধু সফদর হাশমি চকেই শেষ হয়নি এই উন্মাদনা। শোভাযাত্রা এগিয়ে পৌঁছয় তরুণ অ্যাথলেটিক ক্লাবের পার্শ্ববর্তী সুভাষপল্লীর নেতাজি মোড়ে। সেখানেও কাঁধে চেপে বামাকালীর নাচ, মশাল মিছিল, শিবকালীর বিভিন্ন ধরনের হাজরা নাচ এবং শিল্পীদের নানা কলাকৌশল দেখতে উপচে পড়ে মানুষের ভিড়। সন্ধ্যা সাতটা থেকেই যে উন্মাদনার সূত্রপাত হয়েছিল, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে নেতাজি মোড়ে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রাস্তার মোড় জুড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়, মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তোলার হিড়িক এবং শোভাযাত্রাকে ঘিরে মানুষের প্রবল উৎসাহে যান চলাচল ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় পুলিশ প্রশাসনকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। ফলে উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ পরিবেশনা আর চালানো সম্ভব হয়নি। এক কথায়, দর্শকদের বিপুল উৎসাহ ও জনসমাগমের মাঝেই মাঝপথে থামিয়ে দিতে হয় তরুণ অ্যাথলেটিক ক্লাবের এবারের পুজোর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)