শ্রীকান্ত ঠাকুর: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির ধুমপাড়ার মা বিবিহার কালীপুজো। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য এই কালীপুজো। হিন্দু-মুসলিমের মিলনমেলায় পরিণত হয় পুজো। চলে প্রসাদ বিতরণ।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বংশীহারী ব্লকের ধুমপাড়া গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থিত মা বিবিহার কালীমন্দির। প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছে। কালীপুজোর রাতে এই জাগ্রত দেবীর মন্দিরকে ঘিরে বসে ভক্তদের মিলনমেলা। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে পুজোর আয়োজন থেকে শুরু করে মেলা পরিচালনা—সবেতেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৯০০ সালে বৃন্দাবন সিং এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে বংশপরম্পরায় সেই পুজো আজও চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মা বিবিহারের পুজো এই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মুসলিমপ্রধান এই অঞ্চলে মা বিবিহারের পুজোকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। পার্শ্ববর্তী বরখইর-সহ বিভিন্ন গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও পুজোয় অংশ নেন। অনেকে মায়ের কাছে মানত করেন, ভোগ নিবেদন করেন। আবার মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শ্রদ্ধাভরে সালাম জানান মুসলিম ভক্তরা। ধর্মীয় বিভেদকে দূরে সরিয়ে রেখে এই পুজো যেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ের সেতুবন্ধন হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের বিশ্বাস, মা বিবিহার অত্যন্ত জাগ্রত দেবী। মানসিক শান্তি, রোগমুক্তি এবং মনস্কামনা পূরণের আশায় প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ মায়ের দরবারে হাজির হন। দীপাবলি ও অমাবস্যার এই বিশেষ দিনে গোটা গ্রাম যেন ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
পুজোর পরের দিন খিচুড়ি প্রসাদ বিতরণকে কেন্দ্র করে আরও বেশি মানুষের সমাগম হয়। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই একসঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করেন। সারা বছর এলাকার মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন এই বিশেষ দিনটির জন্য। ঘন জঙ্গল ও ধানক্ষেতের সরু রাস্তা পেরিয়ে মন্দিরে পৌঁছন দূরদূরান্তের ভক্তরা। দুর্গম পথের ক্লান্তি ভুলে মায়ের দর্শন এবং প্রসাদ গ্রহণে তাঁদের উৎসাহ থাকে চোখে পড়ার মতো।
ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও বিশ্বাস, ভক্তি ও মানবিকতার বন্ধনে একত্রিত হওয়ার এই দৃশ্যই মা বিবিহার কালীপুজোকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। ধুমপাড়ার এই প্রাচীন পুজো আজ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)