বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্য়ায়: রাজ্যে নারী নির্যাতন, শ্লীলতাহানি কিংবা ধর্ষণের মতো অভিযোগ যখন বার বার সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে, তখন নিজের নিরাপত্তার জন্য মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর উদ্যোগ নিল আসানসোল। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কবাডি কিংবা খো-খোর পাশাপাশি এবার মেয়েদের শরীরচর্চা ও আত্মরক্ষার নতুন পাঠ দিচ্ছে কেরলের প্রাচীন মার্শাল আর্ট ‘কলরিপায়াত্তু’।
‘কলরিপায়াত্তু’ প্রশিক্ষণ শিবির
আসানসোল ইনডোর স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে দশ দিনব্যাপী নারী আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ শিবির। আসানসোল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই শিবিরে কেরল থেকে প্রায় ১০ জন প্রশিক্ষকের একটি দল এসে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আয়োজকদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের প্রশিক্ষণ শিবিরের অন্যতম প্রথম উদ্যোগ এটি।
শুধু আসানসোল নয়, বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া-সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মেয়েরা এসে এই দশ দিনের শিবিরে অংশ নিয়েছেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিবিরে প্রায় ১৮০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। শুরুতে ১৬০ জনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আগ্রহের কারণে নিবন্ধনের সংখ্যা বেড়ে যায়।
লাঠি, বর্শা-সহ বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহার থেকে শুরু করে শরীরের ভারসাম্য, ক্ষিপ্রতা, আক্রমণ প্রতিহত করার কৌশল—প্রশিক্ষণের একাধিক দিক শেখানো হচ্ছে। তবে এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য লড়াই শেখানো নয়, বরং বিপদের মুহূর্তে নিজের উপস্থিত বুদ্ধি, শরীরের সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে রক্ষা করার মানসিকতা তৈরি করা।
বেড়েছে আত্মবিশ্বাস
প্রশিক্ষণরত ছাত্রীদের কথায়, কয়েক দিন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরেই নিজেদের মধ্যে বদল অনুভব করছেন তাঁরা। আগে টিউশন বা পড়াশোনা শেষে বাড়ি ফেরার সময়ে পরিবারের কেউ সঙ্গে না থাকলে যে ভয় কাজ করত, এখন সেই ভয় অনেকটাই কমেছে। আত্মরক্ষার কৌশল শেখার পাশাপাশি বেড়েছে আত্মবিশ্বাসও।
কেউ বলছেন, ‘‘এত দিন মনে হত বিপদে পড়লে কী করব! এখন অন্তত জানি, নিজেকে রক্ষা করার জন্য কী ভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।’’
আসানসোলের বাসিন্দা নীতা দাস বলেন, কলরিপায়াত্তু সম্পর্কে আগ্রহ থেকে তিনি নিজে কেরলে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। পরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা আসানসোল উত্তর বিধায়ক বিজেপি রাজ্য নেতা কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়কে জানান। বিষয়টি জানার পরই দ্রুত দশ দিনের এই প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজনের উদ্যোগ নেন বিধায়ক।
বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, মেয়েদের আত্মনির্ভর করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তাঁর কথায়, শুধু আসানসোলেই নয়, আগামী দিনে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট পরিসরে এই ধরনের প্রশিক্ষণ শিবির করার পরিকল্পনা রয়েছে। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে নিয়মিত ব্যবধানে এমন প্রশিক্ষণ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মেয়েদের বক্তব্য, এক দিনের বা দশ দিনের প্রশিক্ষণেই সবটা শেখা সম্ভব নয়। তাই আসানসোলের বিভিন্ন প্রান্তে সপ্তাহে অন্তত দু’দিন করে নিয়মিত কলরিপায়াত্তু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলে আরও বেশি ছাত্রী এই খেলায় যুক্ত হতে পারবেন।
কী এই কলরিপায়াত্তু?
কেরলের ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট কলরিপায়াত্তু বিশ্বের প্রাচীনতম যুদ্ধকলাগুলির অন্যতম বলে পরিচিত। কেরল ট্যুরিজমের তথ্য অনুযায়ী, এর ঐতিহ্য ৩,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো বলে ধরা হয়। তবে এর সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ‘কলরি’ বলতে প্রশিক্ষণের স্থান এবং ‘পায়াত্তু’ বলতে অনুশীলন বা যুদ্ধকৌশল বোঝায়। শরীরের নমনীয়তা, ভারসাম্য, ক্ষিপ্রতা, একাগ্রতা এবং আত্মরক্ষার কৌশলের পাশাপাশি লাঠি, বর্শা, তরবারি-ঢাল-সহ বিভিন্ন অস্ত্রের প্রশিক্ষণও এর অংশ। বর্তমানে এটি শুধু যুদ্ধকলা নয়, শরীরচর্চা, আত্মরক্ষা ও মানসিক শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ হিসাবেও চর্চিত হচ্ছে।
আসানসোলের ইনডোর স্টেডিয়ামে সেই প্রাচীন কেরলীয় যুদ্ধকলারই নতুন পাঠ নিচ্ছেন বাংলার মেয়েরা। শরীরচর্চার সঙ্গে আত্মরক্ষার কৌশল—এই দুইয়ের মেলবন্ধনই এই প্রশিক্ষণকে অন্য খেলাগুলির থেকে আলাদা মাত্রা দিচ্ছে বলে মনে করছেন প্রশিক্ষণরত ছাত্রীরা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)