বাসুদেব চট্টোপাধ্যায়: একদিন যে কারখানায় ঘুরত হাজার চাকা, আজ সেখানে জঙ্গল! মুখ্যমন্ত্রীর শুভেন্দু অধিকারীর সাইকেল ঘোষণায় ফের আশায় আসানসোল। একদিন এই কারখানার তৈরি সাইকেল ছুটত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ঠিকানা ছিল এই কারখানা। আজ সেই জায়গায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে শুধু ফাঁকা জমি, আগাছা আর জঙ্গল।
আসানসোলের সেন-র্যালে সাইকেল কারখানা। একসময় এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সাইকেল কারখানা হিসেবে পরিচিত এই শিল্প প্রতিষ্ঠান ২০০২ সালের জানুয়ারিতে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এত বছর পর ফের সেই সাইকেলের চাকা ঘোরার স্বপ্ন দেখছেন শিল্পাঞ্চলের মানুষ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলায় সাইকেল তৈরির ঘোষণার পর পুরনো কারখানার শ্রমিকদের চোখে যেন ফিরে এসেছে হারানো দিনের ছবি।
১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশ দিয়ে এগোলেই চোখে পড়ে সেন-র্যালে সাইকেল কারখানার বিস্তীর্ণ এলাকা। কখনও যেখানে সারি সারি মেশিনের শব্দে মুখর থাকত গোটা চত্বর, আজ সেখানে নীরবতা। কোথাও ভাঙা পরিকাঠামো, কোথাও আগাছা আর জঙ্গল। যে জায়গাকে একসময় শিল্পাঞ্চলের গর্ব বলা হত, আজ সেই জায়গাটিকেই দেখে চেনা কঠিন।
১৯৪৯ সালে আসানসোলে সেন-র্যালে গোষ্ঠীর কারখানা গড়ে ওঠে। ১৯৫১ সালে শুরু হয় উৎপাদন। র্যালে, রবিনহুড, হাম্বার—একাধিক পরিচিত ব্র্যান্ডের সাইকেল তৈরি হত এখানে। একসময় প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী এই কারখানায় কাজ করেছেন। পরবর্তীতে কারখানার নাম হয় ‘সাইকেল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড’। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে উৎপাদন কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ১৮ জানুয়ারি বন্ধ হয়ে যায় কারখানা।
কারখানা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে শুধু একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি। বদলে গিয়েছিল হাজার হাজার পরিবারের জীবন। রেল, ইস্পাত বা কয়লাখনির কাজ ছেড়ে অনেকে যোগ দিয়েছিলেন এই কারখানায়। ভিন জেলা, এমনকী ভিন রাজ্য থেকেও শ্রমিক এসেছিলেন। কর্মসূত্রে এসে তাঁরাই হয়ে উঠেছিলেন আসানসোলের বাসিন্দা। আজ তাঁদের অনেকেই নেই। যাঁরা আছেন, তাঁদের চোখে এখনও জীবন্ত সেই পুরনো দিন।
প্রাক্তন শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানা বন্ধ হওয়ার আগেই বড় বড় মেশিন খুলে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি, প্রকাশ্যেই চলে গিয়েছিল কারখানার বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি। সেই সময়ের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন প্রাক্তন কর্মী। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও পুরোপুরি মুছে যায়নি সেই স্মৃতি। আজও কারখানার পুরনো আবাসন এলাকায় বসবাস করেন বহু পরিবার। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম এখানেই বড় হয়েছে।
কেউ কাপড়ের দোকানে কাজ করেন, কেউ ওষুধের দোকানে, কেউ আবার অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে। কারখানার সেই পুরনো দিন নেই, কিন্তু উৎসব আছে। এখনও দুর্গাপুজো হয়, বিশ্বকর্মা পুজোয় পুরনো স্মৃতি ফিরে আসে, বসে বাজার-হাট। অর্থাৎ কারখানা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু কারখানাকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনপদটা বেঁচে আছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই এবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে শিল্পাঞ্চল।
𝗔𝘀𝗮𝗻𝘀𝗼𝗹’𝘀 𝗵𝗶𝘀𝘁𝗼𝗿𝗶𝗰 𝗦𝗲𝗻-𝗥𝗮𝗹𝗲𝗶𝗴𝗵 𝘀𝗶𝘁𝗲 𝗲𝘆𝗲𝗱 𝗳𝗼𝗿 𝗻𝗲𝘄 𝗯𝗶𝗰𝘆𝗰𝗹𝗲 𝗳𝗮𝗰𝘁𝗼𝗿𝘆. West Bengal is set to manufacture bicycles for students under the Sarthi scheme, with land being identified. In Asansol, residents want the abandoned Sen-Raleigh site in Kanyapur to be considered. Established in 1951 over 650 acres, the factory once employed 4,500 workers. Its bicycles, including Balaka and Humber, were sold across India and exported. The factory was later taken over by the Centre and renamed Cycle Corporation of India. Production largely stopped by the mid-1980s before it shut in 2002. Residents say more than 600 acres remain, along with railway connectivity, an export platform and tracks. They want the site reused for a new bicycle factory, creating local jobs and reviving the area.
— The West Bengal Index (@TheBengalIndex) October 3, 2026
২৯ সেপ্টেম্বর হাওড়ায় ‘সারথি’ সাইকেল প্রকল্পের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ১২.৫৯ লক্ষ পড়ুয়াকে সাইকেল দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলায় সাইকেল উৎপাদনের জন্য শিল্পপতিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সাইকেল তৈরির কারখানার জন্য জমি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেই আসানসোলের পুরনো শ্রমিকদের মনে উঠেছে একটাই প্রশ্ন— যে মাটিতে একদিন হাজার হাজার সাইকেল তৈরি হত, সেই মাটিতেই কি আবার ঘুরবে সাইকেলের চাকা? চোখের সামনে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার জায়গায় যদি ফের কারখানা তৈরি হয়, তাহলে শুধু একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান ফিরবে না, ফিরতে পারে কর্মসংস্থান। ফিরতে পারে পুরনো শিল্পাঞ্চলের সেই ব্যস্ততা। আর ফিরতে পারে বহু পরিবারের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।

একটা পুরনো সাইকেল। চাকা হয়তো আজ আর ঘোরে না। কিন্তু সেই সাইকেলই সাক্ষী একটা সময়ের—যখন আসানসোলের এই কারখানায় তৈরি হওয়া সাইকেল ছিল শিল্পাঞ্চলের পরিচয়ের অংশ। আজ সেই পুরনো সাইকেলের উপর হাত রেখে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছেন প্রাক্তন শ্রমিকরা। একদিকে জঙ্গলে ঢেকে যাওয়া কারখানা। অন্যদিকে নতুন করে বাংলায় সাইকেল তৈরির ঘোষণা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই মানুষগুলো—যাঁরা একদিন নিজেদের শ্রমে এই কারখানাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
তাঁদের চোখে আজও জল আসে। তবে সেই জল শুধু হারানোর নয়। তার সঙ্গে মিশে আছে একটা আশাও— সেন-র্যালে কি আবার ফিরবে? ফিরবে কি আসানসোলের সেই হারানো শিল্পের দিন? সময়ই দেবে উত্তর। একসময় এই কারখানার গেট দিয়ে ঢুকত শ্রমিকের ঢল, আর বেরিয়ে আসত হাজার হাজার সাইকেল। আজ সেই গেটের জায়গায় নীরবতা। কিন্তু রাজ্যে ফের সাইকেল উৎপাদনের ঘোষণায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন এই কারখানার প্রাক্তন শ্রমিকরা। তাঁদের একটাই দাবি—অন্য কোথাও নয়, এই জমিতেই ফিরুক সাইকেলের কারখানা, ফিরুক আসানসোলের হারানো শিল্পের ঐতিহ্য।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)