লক্ষ্মী সরা এঁকেই জীবিকা, তাহেরপুরের পালপাড়ায় চাহিদা বাড়লেও জোগান কম
Lakshmi Sora: দুর্গাপুজো শেষ হতেই লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত নদিয়ার তাহেরপুরের পালপাড়ার শিল্পীরা। বংশপরম্পরায় লক্ষ্মী সরা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এখানকার প্রায় ২৫টি পরিবার। বছরে প্রায় দু'লক্ষ সরা তৈরি করে কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করেন তাঁরা।
বিশ্বজিত্ মিত্র: দুর্গাপুজো শেষ হতেই লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি, কয়েক দশকের ঐতিহ্য ধরে রেখে বছরে প্রায় দু'লক্ষ সরা তৈরি করেন তাহেরপুরের পালপাড়ার শিল্পীরা। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর প্রতিটি পার্বণকে ঘিরেই প্রয়োজন হয় নানা উপকরণের। দুর্গাপুজো শেষ হতেই এবার ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি। আর সেই পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ লক্ষ্মী সরা তৈরি ও বিক্রিতে ব্যস্ত নদিয়ার তাহেরপুরের পালপাড়ার বাসিন্দারা। বংশপরম্পরায় কয়েক দশক ধরে লক্ষ্মী সরা তৈরি করে আসছেন তাঁরা। সরা তৈরি, তাতে রং-তুলির টানে দেবদেবীর ছবি আঁকা এবং সেই সরা বিক্রি করেই চলে তাঁদের সংসার।
তাহেরপুরের পালপাড়ায় লক্ষ্মী সরা তৈরির এই কাজ শুধুমাত্র জীবিকা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পীদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকটি পরিবার তাহেরপুরের পালপাড়ায় এসে বসবাস শুরু করে। পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৫টি পরিবার সরা তৈরির পারিবারিক পেশাকে আঁকড়ে ধরে রাখে। আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম।
আরও পড়ুন, আধুনিকতার ভিড়ে হারাচ্ছে লোকগান, রাজবংশী সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়ছেন ৮০ বছরের মনসিং
লক্ষ্মীপুজোর মরসুমে সরার চাহিদা বাড়লেও শিল্পীদের কাজ অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশাখ মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় সরা বিক্রি। সারা বছর ধরেই চলে সরা তৈরি ও ছবি আঁকার কাজ। পালপাড়ার বাসিন্দারা বছরে প্রায় দু'লক্ষ সরা তৈরি করেন। তাহেরপুর থেকে সেই সরা সরবরাহ করা হয় কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। লক্ষ্মী সরার উপর শিল্পীদের তুলির টানে ফুটে ওঠে নানা ধরনের চিত্র। একা লক্ষ্মী, লক্ষ্মী-নারায়ণ, তিন লক্ষ্মী, পাঁচ পুতুল কিংবা দুর্গার মতো বিভিন্ন নকশায় তৈরি হয় সরা। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এই বৈচিত্র্যময় শিল্পকর্ম তৈরি করেন শিল্পীরা। প্রতিটি সরায় ফুটে ওঠে তাঁদের দক্ষতা, পরিশ্রম ও শিল্পসত্তার পরিচয়।
শিল্পীদের কথায়, এ বছর লক্ষ্মী সরার ভালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শিল্পীর অভাবে সেই চাহিদা অনুযায়ী সরা তৈরি করে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে বাড়ছে চাহিদা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই পেশায় আসার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি বাজারের চাহিদা পূরণ করাও তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বাঙালি ঘরে ঘরে লক্ষ্মীলাভের আশায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করেন। আর সেই পুজোর অন্যতম উপকরণ লক্ষ্মী সরা তৈরি করে সংসার চালান তাহেরপুরের পালপাড়ার শিল্পীরা। কিন্তু দেবী লক্ষ্মীর প্রতিমূর্তি ও ছবি তৈরি করলেও তাঁদের নিজেদের সংসারে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য সব সময় ধরা দেয় না। সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পকে।
আরও পড়ুন, আত্মসমর্পণের পরই চোরবাগান বিপর্যয়ে গ্রেফতার কালিয়া, স্ত্রীর বিস্ফোরক দাবি
লক্ষ্মীপুজোর মরসুমে তাঁদের তৈরি সরায় যখন ঘরে ঘরে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা হয়, তখন সেই শিল্পকর্মের আড়ালে থেকে যায় শিল্পীদের নিরলস পরিশ্রম, জীবনসংগ্রাম এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। লক্ষ্মী সরা তৈরি করেই লক্ষ্মীলাভের স্বপ্ন দেখেন তাহেরপুরের পালপাড়ার শিল্পীরা। তাঁদের সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবের মুখ দেখবে, তা নির্ভর করছে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং শিল্পীদের জীবিকার সুরক্ষার উপর।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)