পার্থ চৌধুরী: ব্রিটিশ আমলের প্রতিবাদ ও আইনি লড়াইয়ের সাক্ষী বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী ‘ফৌজদারী কালী’। একটা কালীপুজোর ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে রয়েছে একটা ফৌজদারি মামলা, জনশ্রুতি আর পুরনো শহরের কিছু মানুষের আবেগ। সেই জনশ্রুতি আর ইতিহাসকে মাথায় রেখে আজও এক আবেগ,উৎসাহ আর আগ্রহ বহমান বর্ধমানে। এটা এমন একটা পুজো যার পুজোর চেয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রার গুরুত্ব আজও বিরাট।
বর্ধমান শহরের খোসবাগান এলাকার রাজরাজেশ্বর শিবতলার এই কালীপুজোর নেপথ্যে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের এক ঐতিহাসিক আইন অমান্য ও প্রতিবাদের ঘটনা। বাংলা ১৩৪৫ সালের (১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ) আগে এই দেবী মূলত ‘বাগদী পাড়ার কালী’ রূপেই পূজিতা হতেন। সেই সময় রাজরাজেশ্বর শিব মন্দির সংলগ্ন এলাকায় রাজার অনুমতি ছাড়া স্থায়ী মণ্ডপ তৈরি সম্ভব ছিল না। ফলে একটি কুলগাছের নিচে তালপাতার অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে গৌরী ঠাকুর, নরেন ঠাকুর, অবিনাশ মাঝি, সনাতন মাঝি ও দুখীরাম পরামানিক প্রমুখ স্থানীয় মানুষ চার আনার মতো স্বল্প চাঁদায় এই পুজোর আয়োজন করতেন।। পরবর্তীতে নারায়ণবাবুর পুত্র শম্ভু ঘোষ মন্দিরের বেদিটি পাকা করে দেন।
এই পুজোর নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার এক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। সেই সময়কার লীগ মন্ত্রিসভা আইন প্রণয়ন করে যে,অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনা গৃহের সামনে দিয়ে কোনো হিন্দু দেবদেবীর বিসর্জনের শোভাযাত্রা বা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যাওয়া যাবে না। অথচ বর্ধমানের কৃষ্ণসায়র, শ্যামসায়র বা রাণীসায়রে প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য এই উপাসনা গৃহগুলোর সামনে দিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না। এমনকি উপাসনা গৃহের একশো গজের মধ্যে বাজনা না বাজিয়ে নীরবে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার আবেদন জানানো হলেও তা নামঞ্জুর করা হয়।
এই অদ্ভুত আইনের প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন বর্ধমানের মানুষ। শহরের বিশিষ্ট আইনজীবী গিরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে বলাই মুখোপাধ্যায়, শ্রীকুমার মিত্র, রাজকৃষ্ণ দত্ত, প্রণবেশ্বর সরকার,প্রণব কুমার সান্যাল, প্রাণদা মুখোপাধ্যায় ও যতীন্দ্রনাথ বিষ্ণু প্রমুখ একটি গোপন বৈঠক করেন।
আরও পড়ুন-২০০ বছরের ঐতিহ্য! হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির অনন্য নজির ধুমপাড়ার মা বিবিহার কালীপুজো
যেহেতু, বাড়ির পুজোর প্রতিমা নিয়ে আইন ভাঙলে সেই বাড়ির কর্তাকে সরাসরি আইনি শাস্তির মুখে পড়তে হবে, তাই যতীন্দ্রনাথ বিষ্ণুর প্রস্তাব অনুযায়ী বাগদী পাড়ার এই বারোয়ারি কালীপ্রতিমাটি নিয়েই আইন অমান্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ৩০শে কার্তিক রাত আটটায় মাত্র একটি ঢোল ও কাঁসি বাজিয়ে খোসবাগান পাড়ার কিশোর তিনকড়ি মুখোপাধ্যায়ের মাথায় প্রতিমা চাপিয়ে শহর পরিক্রমা ও বিসর্জনের শোভাযাত্রা বের করা হয়। রাস্তায় সাধারণ মানুষও হ্যাজাক ও কাঁসর-ঘণ্টা নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই মিছিলে শামিল হন।
তৎকালীন বর্ধমান থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার মহম্মদ বাবর আলি সাহেব কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শোভাযাত্রা ও বিসর্জন সম্পন্ন হতে দিলেও, বিসর্জনের পর আইন অমান্যকারী যুবকদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করেন।
বর্ধমান আদালতে তাঁদের ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা হয়। পরে কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করা হলে তৎকালীন ব্যারিস্টাররা বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়ে সকলকে সসম্মানে মুক্তি দেন এবং শোভাযাত্রার আইনসম্মত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
জনশ্রুতি রয়েছে, আদালতের সেই মামলায় মা কালী স্বয়ং সাক্ষী দিয়ে তাঁর সন্তানদের মুক্ত করে এনেছিলেন। ফৌজদারি মামলা জয় করে মা তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেছিলেন বলেই এই দেবী ‘ফৌজদারী কালী’ নামে সর্বজনবিদিতা হন।
সেদিন মাকে কাঁধে ও মাথায় করে শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে, সেই ঐতিহ্য মেনে আজও চতুর্দোলায় চাপিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে মায়ের বিসর্জন সম্পন্ন হয়। পুজো কমিটির সহ সভাপতি অচিন্ত্যাভ ভট্টাচার্য, সহেলী পালের মত স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, আজও নিষ্ঠা ও প্রাচীন রীতি মেনে মায়ের পুজো, বলিপ্রথা, দণ্ডি কাটা, ধুনো পোড়ানো এবং অন্নকূট ভোগের আয়োজন করা হয়। কালীপুজোর দিন দুপুরে পাড়ার মহিলারা বাজনা সহকারে শোভাযাত্রা করে মাকে নিয়ে আসেন। তিন দিন মা থাকেন এবং প্রথা অনুযায়ী ভাইফোঁটার পরের দিন মায়ের নিরঞ্জন হয়; তবে সেই দিন বৃহস্পতিবার পড়লে তার পরের দিন বিসর্জনের শোভাযাত্রা বের করা হয়।রীতি মেনে আয়োজন হয় জলসারও। দূর-দূরান্ত থেকে অগণিত ভক্ত আজও মানত পূরণ করতে ছুটে আসেন ঐতিহাসিক এই ফৌজদারী কালীর মন্দিরে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)