জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাবার খুনের মূল অভিযুক্ত পুলিসের চোখে ধুলো দিয়ে প্রায় ৪৫ দিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। অভিযোগ, ইসলামপুর থানা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে বাস টার্মিনাস এলাকায় প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করছিল সেই অভিযুক্ত। অবশেষে নিজের তুতো বোন সুতপাকে সঙ্গে নিয়ে সেই অভিযুক্তকে ধরে পুলিসের হাতে তুলে দিলেন নিহতের মেয়ে সঙ্গীতা মণ্ডল। শুক্রবার সন্ধ্যায় ইসলামপুর বাস টার্মিনাস এলাকায় কার্যত ফিল্মি কায়দায় ধস্তাধস্তি করে অভিযুক্তকে পাকড়াও করেন দুই বোন। তাঁদের সাহসিকতায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় মানুষজন। ঘটনার সময় সঙ্গীতার সাদা প্যান্ট ও টি-শার্ট কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। সেই পোশাকই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিল অভিযুক্তকে ধরতে তাঁর লড়াইয়ের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে ইসলামপুর থানার নন্দঝার এলাকার আলিপুরে এই ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ, নিজের দাদা রবীন্দ্রনাথ মণ্ডলকে দুষ্কৃতীদের মারধরের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত হন তাঁর ভাই রঞ্জিৎ মণ্ডল। কৌশিক মণ্ডল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রঞ্জিৎবাবুকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুক্ষণ পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় ১৬ সেপ্টেম্বর ইসলামপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে রঞ্জিৎ মণ্ডলের পরিবার। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিস। ঘটনার প্রায় সাত দিন পর মূল অভিযুক্ত কৌশিক মণ্ডলের বাবা পুলিসের হাতে ধরা পড়লেও কৌশিক-সহ আরও কয়েকজন অভিযুক্ত অধরা ছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর থেকেই পুলিসের নাগালের বাইরে ছিল কৌশিক।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার প্রায় ৪৫ দিন পরেও মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিস। অথচ শুক্রবার সন্ধ্যায় ইসলামপুর বাস টার্মিনাস এলাকায় হঠাৎই বাবার খুনের মামলার মূল অভিযুক্ত কৌশিক মণ্ডলকে দেখতে পান সঙ্গীতা।
জানা গিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় ইসলামপুরে নিজের জেঠুর বাড়ির উদ্দেশ্যে এসেছিলেন সঙ্গীতা। সেই সময় বাস টার্মিনাস এলাকায় তাঁর নজরে পড়ে কৌশিক মণ্ডল। ইসলামপুর থানা থেকে অল্প দূরত্বে অভিযুক্তকে ঘোরাফেরা করতে দেখে প্রথমে কিছুটা সতর্ক হন তিনি। তড়িঘড়ি ঝাঁপিয়ে না পড়ে দূরত্ব বজায় রেখে কৌশিকের গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করেন সঙ্গীতা। পাশাপাশি ফোন করে আলিপুরে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। ইসলামপুরে থাকা তাঁর তুতো বোন সুতপাকেও দ্রুত সেখানে আসতে বলেন।
এদিকে বাস টার্মিনাস এলাকার একটি বিরিয়ানির দোকানে খাবার কিনতে যায় অভিযুক্ত কৌশিক। সেই সুযোগেই সেখানে পৌঁছন সুতপা। বোনকে কাছে পেয়ে আর দেরি করেননি সঙ্গীতা। আচমকাই কৌশিককে জাপটে ধরে ফেলেন তিনি। এরপরই শুরু হয় ধস্তাধস্তি। পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে অভিযুক্ত। কিন্তু সঙ্গীতা তাঁকে ছাড়তে নারাজ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় মানুষের সাহায্য চান সুতপা।
এরপর রাস্তার ধারের কাদামাখা জায়গায় শুরু হয় কার্যত কুস্তির লড়াই। একদিকে পালানোর চেষ্টা করছে অভিযুক্ত, অন্যদিকে তাকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সঙ্গীতা। সেই সময় স্থানীয় কয়েকজন মানুষ এগিয়ে এসে দুই বোনকে সহযোগিতা করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত কৌশিককে আটকে রাখা সম্ভব হয়। খবর দেওয়া হয় ইসলামপুর থানায়। খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিস। এরপর অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিস।
ইসলামপুর বাস টার্মিনাস এলাকায় তুতো বোনকে সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্তকে পাকড়াও এর পর সবাই সঙ্গীতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কাদামাখা পোশাকেই সাহসিকতার লড়াইয়ের সাক্ষী থাকল শহর
পরে ইসলামপুর থানার সামনে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনার বিবরণ দেন সঙ্গীতা মণ্ডল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে আলিপুরে তাঁর জেঠু রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল দেখতে পান, নিজের পকেটে রাখা ২১০০ টাকা নেই। এদিকে ঘরের দরজার সামনে পড়ে থাকতে দেখা যায় প্রতিবেশী তথা আত্মীয় কৌশিকের স্যান্ডেল। বিষয়টি জানতে কৌশিকের বাড়িতে খোঁজ নিতে যান রবীন্দ্রনাথবাবু। অভিযোগ, সেই সময়ই কৌশিক ও তার পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মারধর শুরু করেন।
জেঠুকে মারধরের খবর পেয়ে তাঁকে বাঁচাতে ছুটে যান সঙ্গীতার বাবা রঞ্জিৎ মণ্ডল। কিন্তু অভিযোগ, কৌশিক ও তার পরিবারের সদস্যরা লাঠি, সোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে রঞ্জিৎবাবুর উপর চড়াও হয়। বেধড়ক মারধরে গুরুতর জখম হন তিনি। পরে গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বাবাকে হারানোর পর থেকেই অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে সরব ছিল রঞ্জিৎ মণ্ডলের পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার মূল অভিযুক্ত কৌশিক দীর্ঘদিন ধরে পুলিসের নাগালের বাইরে ছিল। শুক্রবার সেই অভিযুক্তকেই নিজের হাতে ধরে পুলিসের হাতে তুলে দিলেন নিহতের মেয়ে।
ঘটনার পর থেকে ইসলামপুরের নাগরিক মহলে পুলিসের ভূমিকা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। থানা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে একজন খুনের মামলার অভিযুক্ত কী ভাবে প্রায় ৪৫ দিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। অভিযুক্তকে ধরতে শেষ পর্যন্ত কেন পরিবারের সদস্যদেরই উদ্যোগী হতে হল, উঠছে সেই প্রশ্নও।
অন্যদিকে, সঙ্গীতা ও সুতপার সাহসিকতা এখন ইসলামপুরের মানুষের মুখে মুখে। বাবার মৃত্যুর বিচার পাওয়ার লড়াইয়ে নিজেরাই সামনে থেকে অভিযুক্তকে ধরে পুলিসের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় দুই বোনের সাহসিকতার প্রশংসা করছেন স্থানীয়রা। শুক্রবার সন্ধ্যার সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন ইসলামপুর বাস টার্মিনাস এলাকার বহু সাধারণ মানুষ। তাঁদের চোখের সামনেই ঘটে যায় এক ব্যতিক্রমী ঘটনা-- বাবার খুনের অভিযুক্তকে ধরতে রীতিমতো লড়াইয়ে নামলেন তাঁরই মেয়ে।
দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)