চিত্তরঞ্জন দাস: বিশ্বের প্রথম দুর্গাপুজো? তার হদিস পাওয়া সম্ভব না কি এখনও? হদিস কি, একেবারে চাক্ষুস দেখা যায়, সেখানে পৌঁছনো যায়। তা রয়েছে এই বাংলাতেই। বিশ্বের প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনাস্থল হিসেবে গড় জঙ্গলে গড়চণ্ডীধাম মেধসমুনির পুজোকেই মানা হয়। সেই মেধস মুনি তথা মেধা মুনি, যাঁর আশ্রমের কথা চণ্ডীতে উল্লেখ করা আছে। শাল, সেগুন ও মহুয়া গাছের ঘন জঙ্গলে ঘেরা অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কাঁকসার গড় জঙ্গল সেটি। সেই জঙ্গলের মাঝেই মেধসমুনির আশ্রম, যা গড় জঙ্গল চণ্ডীধাম নামে পরিচিত। লোককথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আশ্রমকেই বিশ্বের প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনাস্থল হিসেবে মনে করা হয়। কথিত আছে, সুরথ রাজা এই জঙ্গল থেকে তিন যোজন দূরে বোলপুরে থাকতেন। একসময় এই জঙ্গলেই মেধসমুনির বাস ছিল। পরবর্তীকালে রাজারা এসে মাটির বেষ্টনী দিয়ে আশ্রমটিকে ঘিরে গড়ে তোলেন দুর্গ। সেই থেকেই এই স্থান-পরিচিতি পায় গড় জঙ্গল নামে।
গড় জঙ্গলের দুর্গাপুজো
রাজ্য হারিয়ে রাজা সুরথ এই মেধমুনির আশ্রমে এসে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি মেধসমুনির কাছে তপস্যা করেন এবং দেবীর আরাধনা করেন। দীর্ঘ তপস্যার পর তিনি নিজের হারানো রাজ্য ফিরে পান। সেই ঘটনাকে ঘিরেই এখানে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এই আশ্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এখানকার দুর্গাপুজোকে ঘিরে রয়েছে প্রাচীন ঋষি-মুনিদের সাধনার ঐতিহ্য। কথিত আছে, ঋষি-মুনিরাই এখানে দেবীর আরাধনা করতেন। এছাড়াও, রাজা সুরথ এই এলাকায় তিনটি অবতারের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই প্রাচীন মন্দির ও আশ্রমকে ঘিরেই আজও গড় জঙ্গল চণ্ডীধামে টিকে রয়েছে বহু বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য।
চণ্ডীধাম
ইতিহাস, পুরাণ, লোকবিশ্বাস এবং প্রাচীন স্থাপত্যের মেলবন্ধনে কাঁকসার গড় জঙ্গল চণ্ডীধাম আজও দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থান। রাজা সুরথ যে স্থানে বসে ধ্যান করতেন সেই বেদী এখনও আছে। অনিমেষ মাজী নামের এক যুবক সেই বেদীতে বসে ধ্যান করার সময় দেবীর দেখা পান। তিনি নাকি আদেশ দেন-- এই বেদীতে আমার পূজো কর! সেই বছর থেকে সেই বেদীতে পুজো হয়ে আসছে। মা দুর্গা এখানে দশভুজা নন।

রাজা সুরথ, সমাধি বৈশ্য
রাজা সুরথকে চন্দ্রবংশীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দূর্গা সপ্তশতী দেবীমাহাত্ম্য এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণে। তিনি তাঁর রাজ্য এবং তাঁর সমস্ত সমস্ত সম্পত্তি হারান। সব হারিয়ে তিনি ভাগ্য ফেরাতে তাঁর রাজধানী বলিপুর (যা বর্তমানে বোলপুর) ত্যাগ করেন। পরে সমাধি বৈশ্যের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সমাধি বণিক ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে তিনিও তখন দেউলিয়া। তাঁর পরিবার তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। তারপর সৌভাগ্যক্রমে তাঁদের সঙ্গে মেধস মুনির দেখা হয়। তিনি নিজেদের ভাগ্য ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁদের দেবী দূর্গার পূজা করতে পরামর্শ দেন।

বাসন্তী পূজার স্মৃতি
মেধসমুনির নির্দেশমতো রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য মেধস মুনির আশ্রমে দেবী দূর্গার সেই প্রথম পূজাটি করেছিলেন। পৃথিবীর এই প্রথম দুর্গোৎসবটি যেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেটি এ-বঙ্গের গড় জঙ্গল। সেই গড় জঙ্গল ঘটনাচক্রে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার দূর্গাপুরে।

তাঁরা বসন্তকালে দেবী দূর্গার পূজাটি করেছিলেন। এই উৎসবকে তাই বলা হয় বাসন্তী পূজা বা বসন্তকালীন দুর্গোৎসব। প্রসঙ্গত, পুজোর পরে সুরথ তাঁর সমস্ত হারানো সম্পত্তি ফেরত পান এবং তিনি তাঁর রাজধানী বলিপুরে (বর্তমানে বোলপুর) ফিরে আসেন। সুরথ বসন্তে তার রাজধানী বোলপুরে দূর্গাপুজো করেছিলেন। এই পুজোর সময় তিনি লক্ষ লক্ষ পশু বলি দেন মায়ের চরণে। এই 'বলি' শব্দ থেকেই এই স্থানটি 'বলিপুর' নামে খ্যাত হয়, যা পরে এখনকার বোলপুরে পরিণত হয়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)