জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পুজো এসে গেলেই বাঙালির জীবনের সমস্ত বৈশিষ্ট্যের উপর পড়ে রঙের পরত। খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-আশাক, ঘোরাঘুরি-ভ্রমণ, গৃহসজ্জা, নাটক-সিনেমা দেখা, সাহিত্যপাঠ-- কত কিছু ইয়ত্তা নেই! এর সঙ্গে যে জিনিসটি না হলে বাঙালিকে 'বাঙালি' বলা-ই যাবে না, সেটা হল 'আড্ডা'। সারা বছরের জন্যই আড্ডাধারী বাঙালি খুব স্পেশাল একটি সাবজেক্ট; কিন্তু বাঙালির পুজোর আড্ডা যেন সবকিছুর চেয়ে আলাদা, অন্যরকম।
প্লেটো-গ্রিস-রোম-অক্সফোর্ড থেকে বাঙালি
কিন্তু আড্ডা বিষয়টার শুরু কবে থেকে? কিছু কি জানা যায়? হ্যাঁ, জানা যায়, যিশু খ্রিস্টের জন্মের চার-পাঁচ শো বছর আগেই আড্ডা নামক বস্তুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। প্লেটো আড্ডা দিতেন। বিশ্বের অনেক দেশেই পরে পরে আড্ডার প্রচলন হয়েছে। অবশ্যই তার ধরন আলাদা। শোনা যায়, রোমানরা নাকি সাংঘাতিক আড্ডাবাজ ছিল। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে মূল বাজার এলাকায় ফোরাম বলে একটি জায়গা থাকত। এই ফোরামই ছিল আড্ডার জায়গা। প্রতিটি রোমান শহরের কেন্দ্রে একটি করে ফোরাম থাকতই বলে জানা যায় ইতিহাস থেকে। আর এই বিশ্বসংস্কৃতির ধারাতেই যেন আড্ডা ক্রমে হয়ে ওঠে বাঙালিরও বিশেষ সংস্কৃতি। তার অভিজ্ঞান। বাঙালি আড্ডাকে এমন স্তের তুলে নিয়ে গিয়েছিল যে, এই সেদিন অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির তাদের একাদশ সংস্করণে আড্ডা শব্দটিকে জায়গা করে দেয়।
ইয়ংবেঙ্গলের আড্ডা
ডিরোজিওকে কেন্দ্র করে সেই সময়কার হিন্দু কলেজের ছাত্রেরা যে আড্ডার আসর বসাতেন, চরিত্রের দিক থেকে তা এক অসাধারণ ব্যাপার ছিল। ক্ষুরধার বুদ্ধিদীপ্ত সংস্কারমূলক যুক্তিবাদী একটা জীবন তাঁরা যাপন করতেন, আর আড্ডাও মারতেন সেই স্তরেরই। ওই আড্ডা থেকেই যে সেই সময়কার বাঙালি সমাজ কতভাবে উপকৃত হয়েছিল, তা আজ আর বোধ হয় পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়!
কাঁঠালপাড়ার আড্ডা
বাঙালির আড্ডার অনেক পর্বান্তর আছে। বুদ্ধিজীবী বাঙালির অনেক কিছুর মতো খাঁটি বাঙালি আড্ডাও হয়তো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতেই শুরু। সাহিত্যসম্রাটের কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে বসত আড্ডার এক দারুণ রঙিন আসর। তাতে বহুজনের সঙ্গে থাকতেন দীনবন্ধু মিত্র হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো উচ্চতার মানুষও। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে, সেই আড্ডার মান কোন তারে বাঁধা থাকত!
গঙ্গাতীরের ডিভাইন আড্ডা
বঙ্কিমের আড্ডা-আসরের বেশ কিছু বছর পরেই কলকাতার উপকণ্ঠে বসতে শুরু করে অন্যরকম এক 'ডিভাইন' তথা 'দিব্য' আড্ডার আসর। তার ভূগোলটা হল রাসমণির দেউল-- দক্ষিণেশ্বরে। সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণকে ঘিরে বসত সেই আসর। প্রথাগত আড্ডা সেটা নয়। সেখানে আলোচিত হত গভীর সব তত্ত্ব, দর্শন, ধর্মকথা। সঙ্গে হত গান। আর হত দেদার মজা আর হাসি। কারা কারা সেখানকার আড্ডাধারী? বাপরে বাপ! বিরাট-বিকাট সব নাম! মহাকবি গিরিশচন্দ্র ঘোষ, বিজ্ঞানী মহেন্দ্রলাল সরকার, কেশব সেন, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, শহরের তরুণ ইন্টেলেকচুয়ালের প্রতিনিধিস্বরূপ মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত তথা পরবর্তীকালের কথামৃতকার 'শ্রীম', কলকাতার বিখ্যাত গায়ক ফুটন্ত নবযুবক নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা পরবর্তীকালের বিশ্ববিজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ। এবং আরও আরও বহুতর নাম। তাঁরা যে-আড্ডাটা সেখানে দিতেন তা যেমন মধুর তেমন গভীর আর তেমনই ফলবান।
আড্ডা এবং ঠাকুরবাড়ি
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও বসত আড্ডা। কখনও ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষণায় শহরের বিভিন্ন জায়গায় হত সেই সব আড্ডা। এর মধ্যে ডিএল রায়, রবীন্দ্রনাথ এবং আরও অনেকের সংঘবদ্ধতায় যে-আড্ডা বসত, তা যেমন রসগ্রাহী তেমন মধুর। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে বসত বঙ্গীয় কলা সংসদের আড্ডা।
রায়বাড়ির আড্ডা
আড্ডা বসত সুকুমার রায়ের বাড়িতেও। সে-আড্ডাও ছিল চরিত্রে অসাধারণ। সেই ঠেকের আড্ডাধারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথও। সুকুমারের অকালপ্রয়াণে সেই আড্ডা-সংস্কৃতি আচমকা বিঘ্নিত হলেও পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য পুত্র তথা বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায় তাঁর বাড়িতে বসাতে শুরু করেছিলেন আড্ডার আসর।
চৌরঙ্গির কফি হাউজ
তবে সত্যজিতের আড্ডা বললেই আসবে কফি হাউজের প্রসঙ্গ। জায়গাটা চৌরঙ্গির কফি হাউজ। ১৯৪৫-৪৬ সালে এই আড্ডায় নিত্য যাতায়াত ছিল সত্যজিৎ রায়, কমলকুমার মজুমদার, রাধাপ্রসাদ গুপ্তের মতো ব্যক্তিদের। চৌরঙ্গি কফি হাউজে বিভিন্ন চরিত্রের ও পেশার লোকজনের সমাগম হত। আসতেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্তের মতো ব্যক্তিত্বরা। ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ রেনোয়াও তাঁর 'দ্য রিভার' ছবির শুটিং চলাকালে এই আড্ডায় বেশ কয়েকবার এসেছিলেন বলে শোনা যায়।
কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজ
আর কফি হাউজ বললেই উঠবে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজের প্রসঙ্গ। আসতেন বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-সহ আরও অনেকে। আড্ডা দিতেন তুষার চৌধুরীর মতো কবি। গল্পকারদের মধ্যে অন্য়তম আড্ডাধারী ছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। শোনা যায়, তার বিষয় উপস্থাপন, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি শ্রোতাদের চুম্বকের মতো টানত। আর কফি হাউজ বললেই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ও মান্না দে'র গাওয়া 'কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই' গানটির কথা উঠবেই। আজও গানটা হন্ট করে আড্ডাপ্রিয় বাঙালিকে।
চায়ের কাপে তুফান
উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের ইকনমিক কেবিন থেকে দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের প্যারাডাইস ক্যাফে। এগুলি ছিল বাঙালির আড্ডার সোনার খনি। মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, তাপস সেন, বিজন ভট্টাচার্য, বংশী চন্দ্রগুপ্তের মতো যশস্বী সব নাম এই ধরনের আড্ডার সঙ্গে জড়িত।
রক থেকে চণ্ডীপণ্ডপ হয়ে ক্লাব
কিন্তু বাঙালির আড্ডা শুধু ড্রয়িংরুমে বা কফি হাউজে বা চায়ের দোকানে নয়। বরং শহরে রকে আর গ্রামে চণ্ডীপণ্ডপে বাঙালির আড্ডার বিরাট ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে বহমান। কলকাতার, বিশেষ করে উত্তর কলকাতার অলি-গলিতে অবস্থিত পুরনো ধাঁচের সব বাড়ি, যেসব বাড়ির গা-লাগোয়া রয়েছে অপূর্ব সব 'রক' (দাওয়া, দালান, বারান্দা-- যে-নামেই তাকে ডাকো)-- সেখানে পূর্বাপর কোনও নোটিস ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্ত ইনফর্মাল নির্ভার হালকাচালের যে-আড্ডা, তার বোধ হয় কোথাও কোনও তুলনা হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, হুঁশ থাকে না কারও। এই ধরনের আড্ডার ঘনত্ব কমে এলেও আজও তা তার মতো করে টিকে আছে। একই বিষয় গ্রামেও। আজকাল হয়তো গ্রামে আর সেভাবে চণ্ডীপণ্ডপ নেই, কিন্তু এককালে গ্রামগুলিতে এই চণ্ডীপণ্ডপের আড্ডা দৈনন্দিন গ্রামজীবনের একটা অভিজ্ঞান ছিল। আজও সেটা চরিত্র বদলে তার মতো করে টিকে আছে। হয়তো এই রক আর চণ্ডীমণ্ডপ মিলেমিশেই পরবর্তীকালে ক্লাবে আড্ডার একটা ধাঁচ তৈরি হয়েছে। যেখানে দেদার তাস-ক্যারম খেলার সঙ্গে রয়েছে হাজারো কর্মসূচি-আলোচনা।
বাঙালির পুজো-আড্ডা
আর আড্ডার এই বহুতর ঐতিহ্যকে জ্ঞানে বা সজ্ঞানে বুকের ভিতরে লালন করতে-করতেই বাঙালি আজও পুজোর আড্ডায় সামিল হয়। পুজোর আড্ডায় সময়ের চেনা ছকটাকে ভাঙাই হয় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হয়তো দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর আড্ডা শুরু হল, বিকেল-সন্ধে গড়িয়েওও তা বয়ে চলল। তারপর চটকা ভাঙলে হয়তো সকলে মিলে প্যান্ডেল হপিংয়ে বেরল। অনুশোচনার কোনও ব্যাপারই নেই। এ আড্ডার মজাই আলাদা। পুজোর আড্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত রাতভোর আড্ডা। ডিনারের পর আড্ডা দিতে শুরু করে কারওরই আর বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। আর, বাঙালির আড্ডা মানে তো শুধু কথা নয়, সঙ্গে গান-বাজনা, একটু হয়তো পান, আর উচ্চৈস্বরে হাসির হররা। ওদিকে কখন যে বাইরে অন্ধকার কেটে গিয়ে হালকা আলোর আভাস দেখা গিয়েছে, কে তার খবর রাখে। অষ্টমীর রাতে আড্ডা দিতে শুরু করে নবমীর ভোরে একেবারে পাঁঠার মাংসের দোকানে গিয়ে লাইন দেওয়ার কত কাহিনি যে বাঙালির পুজোর আড্ডা সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে আছে, তা কে জানে!
জেন জি'র আড্ডা
জেন জি কি আবহমান বাঙালির মতো আড্ডা দেয়? দিতে ভালোবাসে? হ্যাঁ, দেয় হয়তো, তবে তার ধরন-ধারণ বদলেছে, তার চরিত্রও পাল্টেছে। আজ হয়তো আর পটলডাঙার টেনিদা যেভাবে হাবুল-ক্যাবলা-প্যালারামদের নিয়ে রকে বসে আড্ডা মারত, তা আর তারা দেয় না। কিংবা মেস বাড়িতে ঘনাদার আড্ডার যে-চরিত্র, সেটাও হয়তো জেন জি'র নিরিখে অনেকটা বদলেছে। ক্লাবে বসে তাস-ক্যারম খেলার ফাঁকে যে-আড্ডা, বা রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে চা পান করতে-করতে যে-আড্ডা, সেটাও হয়তো আধুনিক প্রজন্মের আড্ডা-অভিধানে সেভাবে পড়ে না; তারা সেটা ক্যাফেতে বা অন্যত্র অন্য ভাবে উদযাপন করে। বাঙালির আড্ডার 'ঠেক' ভেঙে গেলেও, তার আড্ডার দীপ্তি ফিকে হয়নি। পুরনো আড্ডা ক্রমশ স্মৃতির পাতায় ঢুকে গেলেও তৈরি হয়েছে নতুন আড্ডা-প্রকরণ। আর পুজো বোধ হয় আড্ডা কালচারকে উজ্জীবিত করার অন্যতম লগ্ন।
বাঙালির আড্ডা
কিন্তু কেন বাঙালির আড্ডা এত আলোচ্য? বাঙালির আড্ডা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু যা বলেছেন, সম্ভবত সেখানেই এর হদিস লুকিয়ে। কী বলেছেন বু.ব.? আড্ডা নিয়ে বুদ্ধদেব যা বলেছেন তার মর্মার্থ: বাঙালির আড্ডা তুলনাহীন; পৃথিবীর কোনো দেশের, কোনও জাতির মানুষের সঙ্গে এই আড্ডার তুলনা মেলে না। বাঙালির আড্ডার মেজাজ অন্য কোনো দেশে নেই! অন্য দেশের লোক বক্তৃতা দেয়, রসিকতা করে, তর্ক করে, ফূর্তি করে রাত কাটায়, কিন্তু তারা আড্ডা দেয় না। এদেশের ঋতুগুলি যেমন কবিতা জাগায়, তেমনই আড্ডাও জমায়। এদেশের চৈত্রসাঁঝ, বর্ষাসন্ধ্যা, শরতের জ্যোৎস্নাঢালা রাত, শীতের মধুর উজ্জ্বল সকাল-- সবই আড্ডার নীরব ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যায়, কেউ তা শুনতে পায়, কেউ পায় না!
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)