জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দেবী হলেন মা, হলেন মেয়ে! অতীন্দ্রীয় লোক থেকে মহাশক্তিধারিণী দেবী হলেন আটপৌরে বাড়ির সাধারণ বাঙালিঘরের ততোধিক সাধারণ মেয়ে। চণ্ডীতে যা-ই থাক, বাংলায় মা দুর্গা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলার মাটিতে তিনি যেন ঘরের মেয়ে পুজোর সময়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি আসেন। আবার যখন চলে যান, তখন চোখের জলে ভাসে তাঁর পিতৃঘর। উমাবিদায়ে তাই কান্না-ভারাক্রান্ত দশমী। নবরাত্রিতে সারা ভারতে দুর্গা 'দেবী', কিন্তু বাংলায় তিনি 'মেয়ে' বা 'মা'! কীভাবে এটা হল, জানেন?
ঘরের মেয়ে
চণ্ডীতে দুর্গামহিমা এভাবে বর্ণিত নেই। সেটা সম্পূর্ণ ভাবে দেব-অসুরের লড়াই-ঝগড়ার কাহিনি। সেখানে দেবীকে দূর থেকে দেখে প্রণাম করতে হয়। সভয়ে সশ্রদ্ধায় প্রণতি জানাতে হয়। সে-মাতৃমূর্তি দেখলে ভক্তের হয়তো কিছুটা ভয়ও লাগে। কিন্তু বাংলায় এ-পুজোর চেহারাটা মোটেই তেমন থাকেনি। এখানে মা দুর্গা মা তথা মেয়ে। চারদিনের জন্য তিনি বাপের বাড়ি এসেছেন। দশমীতে স্বামীগৃহে ফিরে যাবেন। মেয়ে বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি ফিরতে উদ্যত হলে মা-বাবার যেমন কষ্ট হয়, এখানেও অনুভূতিটা ঠিকত তেমনই।
'দশমী'
'দশমী' কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির আবেগ ও মনখারাপ মিশ্রিত এক অনুভূতি। দশমী এলেই বাঙালির মনে আসে মায়ের ফিরে যাওয়ার শঙ্কা। কেননা, অপেক্ষায় থাকতে হবে গোটা একটা বছর। সাধারণত দুর্গাপুজো শেষ হয় দশমীর মাধ্যমেই। এই দিনেই সমস্ত আচারবিধিপূর্বক দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে পিতৃগৃহ ছেড়ে কৈলাসে স্বামীগৃহে পাড়ি দেন দেবী।
'বিজয়া' কেন?
কিন্তু এই তিথিকে 'বিজয়া দশমী' কেন বলা হয়? দশমীকে 'বিজয়া' বলার কারণ খুঁজলে পৌরাণিক সূত্র কিছু পাওয়া যাবে। মহিষাসুরবধ কাহিনিতে বলা হয়েছে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পরে দশমতম দিনে তাঁর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন দেবী দুর্গা। তাই দিনটিকে 'বিজয়া' বলা হয়।
দশানন থেকে 'দশহর' থেকে 'দশেরা'
বাংলায় যেমন 'দশমী'কে 'বিজয়া দশমী' বলা হয়, তেমনই উত্তর ও মধ্য ভারতেও এই দিনে দশেরা উদযাপিত হয়। তবে তার তাৎপর্য সম্পূর্ণ আলাদা। 'দশেরা' শব্দটির উৎপত্তি 'দশহর' শব্দ থেকে। যার অর্থ-- দশাননের মৃত্যু। আশ্বিনের শুক্লা দশমী তিথিতেই রাবণকে বধ করেছিলেন রাম। রাবণবধের পরে আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে সীতা ও লক্ষ্মণকে নিয়ে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন রাম। রাবণবধ ও রামচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন এই দুই উপলক্ষ্যেই যথাক্রমে পালিত হয় দুটি উৎসব-- দশেরা ও দীপাবলি।
দক্ষের সঙ্গে দেখা মেয়ের
অন্য কাহিনিও আছে, দেবী দুর্গার একবার দক্ষের কন্যা সতী হয়ে জন্ম নেন। সেঘটনা তো সকলের জানা। দক্ষ শিবকে নিমন্ত্রণ তো করেননি, তার উপর সতীর সামনে শিবের নিন্দা করতে থাকেন। স্বামী-নিন্দা সইতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেন সতী। তা জানতে পেরে রেগে গিয়ে শিব এসে দক্ষের যজ্ঞস্থল ধ্বংস করেন। তারপর সতীকে পিঠে নিয়ে ত্রিলোক ঘুরে বেড়ান। পরে বিষ্ণু তাঁর চক্রে সতীর দেহ ৫১টি অংশে বিভক্ত করেন আর তা বিভিন্ন জায়গায় পড়তে থাকে। সতীর মৃতদেহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরে শিব যখন তাঁর ভয়ংকর তাণ্ডব থামালেন, তখন বিষ্ণু তাঁকে দক্ষরাজকে ক্ষমা করে দিতে অনুরোধ করেন। শিব বিষ্ণুর সেই অনুরোধ ফেলতে পারেননি। সন্তানহারা বাবার দুঃখ ঘোচানোর জন্য শিব বলেন, এর পরের জন্মে সতী জন্ম নেবেন হিমালয়কন্যা পার্বতী রূপে। তখন প্রতি বছর বিজয়া দশমীর দিন পার্বতী আসবেন দক্ষপুরীতে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে! তাই এই দিনটি পার্বতীর ঘরে ফেরার দিনও বটে।
আগমনী, বিদায়গানে শোক
মোট কথা বাপের বাড়িতে আগমনের রূপকে ফেলা এই দুর্গাপুজোই বাঙালির প্রাণের পুজো। এর সঙ্গে নবরাত্রির মহা আড়ম্বর বা দশেরার উদযাপনের তেমন যোগ নেই। এ একেবারে আটপৌরে সম্পর্ক। মা-মেয়ের বা বাবা-মেয়ের সম্পর্ক যেমন হয় আর-কি! বাপের বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য উমার আগমন। তারপর আবার ফিরে যাওয়া। এই নিয়েই কত গান কত কাব্য। মা দুর্গার এই চার ছেলেমেয়ে-- কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে নিয়ে মর্ত্যধামে বাপের বাড়ি আসার ছবিটির সঙ্গে বাঙালি পরিবারে মেয়েদের বছরান্তে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসার কাহিনির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। সেই আবহেই বিজয়া দশমীর বিষাদ। বিজয়া দশমীতে দেবী বিসর্জনের সময় রক্তমাংসের মেয়ের জন্য বাবা-মায়ের চোখের জল পড়ার মতো অনুভূতি তৈরি হয়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)