অস্ত্রহীন মা, হাতে সুরাপাত্র-নরমুণ্ড! গোপন সুড়ঙ্গে ঘেরা দেবী চৌধুরাণীর শ্মশানকালী মন্দির আজও রহস্যে ঘেরা
Kali Puja: হাতে অস্ত্র নয়, রয়েছে নরমুণ্ড ও সুরাপাত্র। গোপন সুড়ঙ্গ, বজরা বাঁধার আংটা আর শোল-বোয়াল মাছের ভোগ। শতবর্ষের ইতিহাস ও রহস্যে ঘেরা জলপাইগুড়ির দেবী চৌধুরাণী কালী মন্দির। দেবী চৌধুরাণীর হাতে গড়া জলপাইগুড়ির ঐতিহাসিক শ্মশান কালী মন্দিরে জোরকদমে চলছে পুজোর প্রস্তুতি।
প্রদ্যুৎ দাস: শুরু হয়ে গিয়েছে পুজোর প্রস্তুতি। জলপাইগুড়ি দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দিরে মা-কে রং করতে ব্যস্ত এখন মন্দিরের পুরোহিত। অতি প্রাচীন জলপাইগুড়ি গোশালা মোড়ে দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দিরে সারা বছর ধরেই ভক্তদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। শ্যামা পুজো উপলক্ষে জলপাইগুড়ি জাতীয় সড়কের ধারে গোশালা মোড়ে দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দিরে দূরদূরান্ত থেকে থেকে ভক্তরা মায়ের দর্শন করতে ছুটে আসেন। সরকার বদলের পর এবার মন্দির পরিকাঠামোর উন্নয়নে চিন্তাভাবনা চলছে।
মন্দিরের ইতিহাস
দিনেও গা ছমছমে পরিবেশ। সন্ধ্যা নামতেই নিঝুম হয়ে যায় চারদিক। আজও বলির প্রথা রয়েছে। তবে আগের তুলনায় পাঠা বলি অনেক কম বলে পুরোহিত জানান। শ্মশানকালীর পুজোতে মাকে শোল মাছ, বোয়াল মাছ সহ আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এখানে মা কালীর হাতে কোনও অস্ত্র নেই। মায়ের একহাতে রক্তমাখা নরমুন্ডু আর এক হাতে সুরাবাটি। মায়ের হাতে নেই কোনও অস্ত্র। প্রাচীন এই নিয়ম অনুযায়ী আজও এই পুজোয় মাকে সুরা দেওয়া হয়। জলপাইগুড়ি গোশালা মোড় দেবী চৌধুরানী মন্দিরের প্রাচীন এই কালীপুজোকে ঘিরে এখন সাজো সাজো রব। প্রতিদিনই ভক্তদের আনাগোনা। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ও ছুটে আসেন এই মন্দিরে।
জঙ্গলে ঘেরা চারদিক। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে রুকরুকা নদী। পাশেই রয়েছে শ্মশান। তারই মাঝে দেবী চৌধুরাণীর কালীমন্দির। সন্ধ্যা নামতেই নিঝুম হয়ে যায় চারদিক। মন্দির ঘিরে দিনের বেলাতেও গা ছমছমে পরিবেশ। আর পাঁচটা মন্দিরের চেয়ে এখানকার বিগ্রহ আলাদা। মন্দির ঘিরে রয়েছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস। জনশ্রুতি, মন্দিরের পাশ থেকে বয়ে যাওয়া রুকরুকা নদী দিয়ে বজরায় চেপে আসতেন দেবী চৌধুরাণী। তাঁর হাতেই পুজো শুরু হয় এখানে। আগে বটগাছের নীচে মায়ের পুজো হতো। সেসময় বিশালাক্ষী রূপে দেবীর পুজো করতেন ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগান এলাকার আদিবাসীরা।
এরপর বেশ কিছুদিন এখানে পুজোর দায়িত্ব নেয় জলপাইগুড়ির রাজ পরিবার। কিন্তু জঙ্গলের মাঝে মায়ের পুজো খুব বেশিদিন চালাতে পারেনি তারা। রাজ পরিবার হাত গুটিয়ে নিলে এলাকার বাসিন্দারা নিজেদের কাঁধে তুলে নেন পুজোর দায়িত্ব। অনেক পরে তৈরি হয় পাকা মন্দির। বর্তমান মন্দিরে যেখানে বিগ্রহের বেদী, সেখানে নাকি একসময় বিশাল এক কপিকল ছিল। সেটি ঘোরালেই খুলে যেত গুহার দরজা। সুড়ঙ্গপথে এখান থেকে পৌঁছে যাওয়া যেত জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়ায়। এছাড়াও মন্দির চত্বরে একাধিক গুহার চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, রুকরুকা নদীতে যে বজরা চলাচল করত, কয়েক দশক আগেও তার প্রমাণ ছিল। নদীর ঘাটে বজরা নোঙর করার জন্য ছিল বিশাল থাম। তার গায়ে ছিল লোহার আংটা। ওই আংটায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো বজরা। মন্দির চত্বরে প্রাচীন বটগাছ রয়েছে, মন্দির চত্বরে রয়েছে পঞ্চমুন্ডীর আসন। কৌশিকী অমাবস্যার রাতে সাধনার জন্য আসেন তান্ত্রিকরা। ফি বছরের মতো এবারও মন্দিরে জোরকদমে চলছে কালীপুজোর প্রস্তুতি। উত্তরবঙ্গের কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার সহ বিভিন্ন জেলা তো বটেই, অসম থেকেও ভক্ত-দর্শনার্থীদের অনেকে এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন।
মন্দির কমিটির সম্পাদক দেবাশিস সরকার বলেন, এই মন্দিরের সঙ্গে দেবী চৌধুরাণীর প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। রুকরুকা নদীর সঙ্গে যোগ রয়েছে করলার। আর করলা গিয়ে মিশেছে তিস্তায়। বজরায় চেপে এই নদীপথে যাতায়াত ছিল দেবী চৌধুরাণীর। তখন জঙ্গলে ভরা ছিল চারদিক। শ্বাপদসঙ্কুল। তারই মাঝে বটগাছের নীচে মা কালীর পুজো করেন দেবী চৌধুরাণী।
মন্দিরের পুরোহিত সুভাষ চৌধুরী বলেন, বেশিরভাগ জায়গাতেই কালীপুজোর রাতে দক্ষিণাকালীর পুজো হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে মা শ্মশানকালী। সেজন্য তাঁর এক হাতে নরমুণ্ড, অন্য হাতে সুরাপাত্র। এখানে মায়ের আমিষ ভোগ হয়। ভোগে নানা ধরনের মাছ থাকে। এর মধ্যে শোল ও বোয়াল মাছ থাকবেই। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে পুজোর রাতে বলি দেওয়া হয় একটি পাঁঠা। এছাড়া মানতের পাঁঠা বলি হয়। বলির মাংসও ভোগ দেওয়া হয়। বিগ্রহের এক হাতে যে পাত্র রয়েছে, পুজোর সময় তাতে দেওয়া হয় সুরা। আগে মাটির মূর্তিতে পুজো হলেও ১৯৯৭ সালে রাজস্থানের জয়পুর থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করা হয় মন্দিরে। সেই থেকে ওই মূর্তির পুজো হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন, মহিষ বলি থেকে পান্তা-মাছের ভোগ, ইতিহাস ও জনশ্রুতিতে ঘেরা ৪০০ বছরের মহিষখাগী মাতা
আরও পড়ুন, এবছর ধনতেরাস কখন শুরু, কখন শেষ? সোনা কেনার শুভ মুহরত কখন?
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)