ঝুঁকি জেনেও ফিরেছিলেন দেশে! ৫ বছরের জেল ইরানি পরিচালক জাফর পানাহির, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তিও
দেশের টানে ফিরেছিলেন তেহরানে, কিন্তু মিলল না স্বস্তি! ১ বছরের সাজা ঝুলতেই ফের ৫ বছর ১ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন বিশ্বনন্দিত ইরানি পরিচালক জাফর পানাহি। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি, জারি হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ও দেশত্যাগের চরম নিষেধাজ্ঞা। কী কারণে এই সাজা?
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিশ্ব সিনেমায় যার নাম লেখা স্বর্ণাক্ষরে, সেই খ্যাতনামা পরিচালক এবার নিজের দেশেই ফের কারাবন্দি। ইরানের চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহির ওপর ফের কঠোর পদক্ষেপ করল তেহরানের এক বিপ্লবী আদালত। আগে থেকেই তাঁর এক বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ ছিল। এবার আলাদা এক মামলায় তাঁকে পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতি পাওয়া এই স্বাধীন পরিচালকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে সিনেপ্রেমীরা। আদালত শুধু কারাদণ্ড দিয়েই থেমে থাকেনি; একই সঙ্গে পরিচালকের ওপর দুই বছরের জন্য দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এমনকি তাঁর সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অনুপস্থিতিতেই জারি রায়, বন্ধ করা হল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
জাফর পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি স্থানীয় 'এমতেদাদ নিউজ এজেন্সি'-কে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই রায়টি পরিচালকের অনুপস্থিতিতেই দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই পানাহির ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলি ফ্রিজ করে দেওয়া হয়। এর কারণ জানতে আইনজীবী ও পরিচালক তেহরানের প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে এই নতুন সাজা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায়ের কথা জানতে পারেন। তবে এই দুই মেয়াদের কারাদণ্ড এখনই কার্যকর করা হবে কি না, তা সরকারের বিবেচনাধীন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।
আরও পড়ুন- SRFTI-তে ছাত্র আন্দোলন ঘিরে ফের উত্তেজনা, মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে ৬০ জনের বেশি পুলিস
প্রতিবাদের মাশুল ও সেন্সরশিপকে বুড়ো আঙুল
ইরান সরকারের সঙ্গে জাফর পানাহির বিরোধের ইতিহাস বহু পুরনো। ২০১০ সালে রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে তাঁর ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ, সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং বিদেশযাত্রায় কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ইরানি প্রশাসন। কিন্তু শাসকের এমন চোখরাঙানি কোনো দিনই তাঁর বাকস্বাধীনতা ও শিল্পসত্তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই তিনি একের পর এক সিনেমা গোপনে শুট করেছেন এবং তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেছে।'দ্য সার্কেল', 'অফসাইড', 'দিস ইজ নট আ ফিল্ম', 'ট্যাক্সি' কিংবা 'নো বেয়ার্স'-এর মতো বিশ্বনন্দিত ছবি তাঁর সাহসী প্রতিবাদেরই সাক্ষ্য দেয়। ২০২২ সালে অন্যান্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এসে তিনি গ্রেফতার হন। প্রায় সাত মাস বন্দিজীবনের পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
কানের মঞ্চ থেকে স্বদেশের টান
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৩ সালের এপ্রিলে তাঁর ওপর থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ভ্রমণের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়। বিধিনিষেধ শিথিল হতেই তিনি পাড়ি জমান ঐতিহ্যবাহী কান চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে তাঁর নতুন ছবি 'ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট' প্রদর্শিত হয়। একটি প্রাক্তন বন্দি দল ও তাদের ওপর অত্যাচার চালানো কারারক্ষীর মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এই ছবির গল্প।
আরও পড়ুন- আচমকাই থামল পথচলা, পরিচিত সহকারী পরিচালক দীপঙ্কর সরকারের রহস্যমৃত্যু!
ছবিটির আন্তর্জাতিক প্রচারের উদ্দেশ্যে পানাহি বিভিন্ন দেশে সফর করেন। বিশ্বজুড়ে বিপুল প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি তাঁকে বিদেশে থেকে যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। দেশে ফেরার পর এক বছরের কারাদণ্ডের আশঙ্কা এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের দেশেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। চরম বিপদের ঝুঁকি জেনেও নিজের নীতি ও দেশের মাটিতে বিশ্বাস রেখেই তিনি ফিরছিলেন। কিন্তু দেশে পা রাখতেই আবারও তেহরানের বিপ্লব আদালতের এই রায় তাঁর জীবন ও স্বাধীন শিল্পচর্চাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল। বিশ্বের স্বাধীন চলচ্চিত্র মহল এখন তেহরানের এই পদক্ষেপের দিকে কড়া নজর রাখছে। সিনেমা প্রদেয় স্বাধীন বার্তার ওপর এমন প্রশাসনিক সেন্সরশিপ ও কঠোর দণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে ইতিমধ্যেই নিন্দার ঝড় উঠতে শুরু করেছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)