জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বেসরকারিকরণের ইতিহাসে আইডিবিআই ব্যাংকের (IDBI Bank)বিক্রি হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক বড় ঘটনা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্প্রতি কানাডার ধনকুবের প্রেম ওয়াটসার ফেয়ারফ্যাক্স ফিনান্সিয়াল হোল্ডিংসকে (Fairfax Financial Holdings) আইডিবিআই ব্যাংকের ৬০.৭২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে। মোট চুক্তি প্রায় ৫২,৮৭৮ কোটি টাকার।
কিন্তু মন্ত্রিসভার সিলমোহর মেলার পরেই ম্যাগাজিন ‘বিজনেসওয়ার্ল্ড’-এর (Businessworld) এক প্রতিবেদনে এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে--ফেয়ারফ্যাক্স কি আসলে আইডিবিআই ব্যাংকের নিজের টাকাতেই আইডিবিআই ব্যাংককে কিনে নিচ্ছে?
রহস্যের সূত্রপাত কোথায়?
গত ১৫ অক্টোবর, অর্থাৎ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ঠিক পরের দিন ফেয়ারফ্যাক্সের শীর্ষ কর্তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও অ্যানালিস্টদের সঙ্গে একটি কনফারেন্স কলে (Conference Call) বসেন। বিজনেসওয়ার্ল্ডের হাতে আসা সেই কলের প্রতিলিপিতে (Transcript) দেখা যায়, রেমন্ড জেমসের এক অ্যানালিস্ট ওয়াৎসাকে স্পষ্ট প্রশ্ন করেন-- ফেয়ারফ্যাক্সের আওতাধীন বিমা সংস্থা 'গো ডিজিট' (Go Digit) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান 'আইআইএফএল ক্যাপিটাল' (IIFL Capital)-কে কী ভাবে আইডিবিআই ব্যাংকের অধীনে আনা হবে? ব্যাংক কি নিজের উদ্বৃত্ত নগদ (Excess Cash) দিয়ে বাজারদরে এই শেয়ার কিনবে?
উত্তরে স্বয়ং প্রেম ওয়াটসা জানান...
'আইডিবিআই ব্যাংকে প্রচুর উদ্বৃত্ত পুঁজি (Excess Capital) রয়েছে। তাই তারা স্রেফ নগদ (Cash) দিয়েই শেয়ার কিনবে... আমরা দেখছি চুক্তি কার্যকর হওয়ার সময়েই বাজারদরে নগদ অর্থ মেটানো হবে।'
এর পরেই হিসাবটা পরিষ্কার করে দেন ফেয়ারফ্যাক্সের প্রেসিডেন্ট পিটার ক্লার্ক। তিনি জানান, আইডিবিআই কিনতে ফেয়ারফ্যাক্সের প্রয়োজন প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার। আর গো ডিজিট জেনারেল, গো ডিজিট লাইফ এবং আইআইএফএল ক্যাপিটালে ফেয়ারফ্যাক্সের অংশীদারি আইডিবিআই-এর কাছে বিক্রি করে ফেয়ারফ্যাক্স ঘরে তুলবে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮,৩০০ কোটি টাকা)।
সহজ কথায়, অধিগ্রহণের মোট খরচের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৪ শতাংশ) টাকা ফেয়ারফ্যাক্স তুলতে চাইছে খোদ আইডিবিআই ব্যাংকেরই উদ্বৃত্ত নগদ থেকে।
কী ভাবে ঘুরবে টাকার চাকা? সহজ সমীকরণ বুঝে নিন
গোটা বিষয়টিকে তিনটি ধাপে দেখলে আর্থিক কাঠামোটি স্পষ্ট হয়ে যায়:
প্রথম ধাপ (ব্যাংক কেনা): কেন্দ্র এবং এলআইসি-র (LIC) থেকে আইডিবিআই ব্যাংকের ৬০.৭২ শতাংশ শেয়ার শেয়ার প্রতি ৮১ টাকা দরে কিনে নিচ্ছে ফেয়ারফ্যাক্স।
দ্বিতীয় ধাপ (নিয়ন্ত্রণ দখল): চুক্তি সম্পন্ন হলেই প্রায় ৬১,১৬৪ কোটি টাকার নিট মূল্যের (Net Worth) ব্যাংকের পরিচালন নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ফেয়ারফ্যাক্সের হাতে।
তৃতীয় ধাপ (নিজের সংস্থাকে ক্যাশ আউট): পরিচালন ক্ষমতা পাওয়ার পরই আইডিবিআই ব্যাংক তার উদ্বৃত্ত মূলধন খরচ করে ফেয়ারফ্যাক্সেরই অপর তিন সংস্থা--গো ডিজিট জেনারেল, ডিজিট লাইফ ও আইআইএফএল ক্যাপিটালের বড় অংশের শেয়ার নগদে কিনে নেবে। সেই নগদের জোয়ারেই মিটবে ফেয়ারফ্যাক্সের ব্যাংক কেনার খরচ।
সেই সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের লাভ কী?
এক দশক আগেও আইডিবিআই ব্যাংক খেলাপি ঋণের (NPA) বোঝায় ধুঁকছিল। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ব্যাংকটির প্রায় ৬.৪ বিলিয়ন ডলারের বিরাট ক্ষতি সামাল দিয়েছিল কেন্দ্র ও এলআইসি (LIC)। সাধারণ করদাতা ও বিমা গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে ব্যাংকের পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়।
সেই ত্যাগ ও পুনর্গঠনের ফলেই আজ ব্যাংকের ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও (Capital Adequacy Ratio - CAR) পৌঁছেছে ২৭.১০ শতাংশে-- যা আরবিআই-এর নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার (১১.৫ শতাংশ) দ্বিগুণেরও বেশি।
এখন প্রশ্ন উঠছে, জনগণের টাকায় তৈরি হওয়া এই 'উদ্বৃত্ত পুঁজি' (Excess Capital) কি তবে নতুন বিদেশি মালিকের নিজস্ব ব্যবসা কিনে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করতে ব্যবহার হবে?
চুক্তির পর কেন্দ্রীয় সরকার ও এলআইসির হাতে আইডিবিআই ব্যাংকের প্রায় ৩৪ শতাংশ শেয়ার থাকবে। কিন্তু রিপোর্ট মোতাবেক, চুক্তিতে সরকার কোনো বিশেষ পরিচালন অধিকার (Special Rights) রাখেনি এবং বোর্ড থেকে প্রতিনিধিও প্রত্যাহার করে নেবে। ফলে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের (Minority Shareholders) স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়ে কর্পোরেট মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে।
আরবিআই এবং সেবির কড়া নিয়ম কী বলছে?
এই ধরণের লেনদেনে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির কড়া নজরদারি এড়ানো সহজ নয়:
আরবিআই-এর বিনিয়োগ সীমা (RBI Investment Cap): রিজার্ভ ব্যাংকের বাণিজ্যিক ব্যাংক সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনও ব্যাংক একক কোনও আর্থিক সহায়ক সংস্থায় (Subsidiary) তার পরিশোধিত মূলধন ও রিজার্ভের ১০ শতাংশের বেশি এবং সমস্ত সহায়ক সংস্থা মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি ইকুইটি বিনিয়োগ করতে পারে না। প্রায় ২৮,৩০০ কোটি টাকার সংস্থাকে আইডিবিআই-এর ভেতর ঢোকানো এই নিয়মের সঙ্গে কী ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে এখনও কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
রিলেটেড পার্টি ট্রানজ্যাকশন (Related Party Transactions): যেহেতু ফেয়ারফ্যাক্স একই সঙ্গে আইডিবিআই-এর নিয়ন্ত্রক এবং বিক্রেতা সংস্থারও মালিক, তাই বাজার নিয়ন্ত্রক সেবি-র (SEBI) নিয়ম মেনে অডিট কমিটি ও নিরপেক্ষ সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের ভোটাভুটির সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে।
ডিজিটের মূল্যায়ন (Valuation Concerns): গো ডিজিট লাইফ এখনও শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত (Unlisted) নয়। যে সংস্থার কোনও বাজারদর নেই, তার স্বাধীন ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন (Independent Valuation) কে করবে?
প্রশ্ন শুধু টাকার নয়, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও
বিজনেসওয়ার্ল্ডের ধারাবাহিক রিপোর্টে আইডিবিআই বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আরও কিছু অস্বস্তিকর তথ্য তোলা হয়েছে:
রিজার্ভ প্রাইস বদল: প্রথমে সরকারি মূল্যায়নে প্রতি শেয়ারের ন্যূনতম দাম (Reserve Price) ধরা হয়েছিল ৯৪.৪২ টাকা। কিন্তু বিড জমা পড়ার পর সেই দাম বাতিল করে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বেঞ্চমার্ক নামিয়ে আনা হয় ৭৫.৯৯ টাকায়। শেষমেশ ৮১ টাকায় বিড জেতে ফেয়ারফ্যাক্স, যা ঘোষণার দিনের বাজারদরের থেকেও প্রায় ১০ শতাংশ কম।
স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest): বিক্রির প্রক্রিয়ার সময় এলআইসি-র এক শীর্ষ ডিরেক্টর, যিনি বিনিয়োগ কমিটির সদস্য ছিলেন, তিনি ফেয়ারফ্যাক্স নিয়ন্ত্রিত থমাস কুক ইন্ডিয়ার (Thomas Cook India) বোর্ডেও আসীন ছিলেন।
ফেয়ারফ্যাক্স অবশ্য দাবি করেছে, এই পদক্ষেপে আইডিবিআই ব্যাংকের গ্রাহকরা এক ছাদের নিচে বিমা ও ব্রোকিং পরিষেবা পাবেন এবং ব্যাংক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আর্থিক মহীরুহে পরিণত হবে। তবে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরবিআই (RBI), সেবি (SEBI) এবং বিমা নিয়ন্ত্রক আইআরডিএআই (IRDAI) এই সমীকরণকে কীভাবে অনুমোদন দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশের অর্থ ও ব্যাংকিং মহল।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)