প্রদ্যুৎ দাস: জলপাইগুড়ি লাটাগুড়িতে বন দফতরের উদ্যোগে মহিলাদের স্বনির্ভরতার নতুন দিশা। পর্যটকদের চোখে বনকে নতুনভাবে চিনলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা ও স্কুলছাত্রীরা। বন শুধু বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল নয়, বনকে ঘিরেই তৈরি হতে পারে স্থানীয় মহিলাদের স্বনির্ভরতার নতুন দিশা। সেই ভাবনাকে সামনে রেখে জলপাইগুড়ির লাটাগুড়িতে বন দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত হল এক অভিনব কর্মসূচি। গরুমারা জাতীয় উদ্যান ও লাটাগুড়ি বনাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা এবং স্কুলছাত্রীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে তাঁরা পর্যটকদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেদের চেনা বনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পান।
চেনা বনকেই নতুনভাবে চেনা
উত্তরবঙ্গের অতিরিক্ত প্রধান মুখ্য বনপাল (APCCF) ড. অনুপমার নির্দেশনায় স্থানীয় বন দফতরের উদ্যোগে এই বিশেষ বনভ্রমণ ও জনসম্পৃক্ততা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণ এবং বনভিত্তিক পর্যটনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পরিচিত করানো হয়। যে বনাঞ্চলের আশপাশে তাঁদের বেড়ে ওঠা, সেই চেনা বনকেই এবার তাঁরা দেখলেন এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। পর্যটকেরা বনভ্রমণের সময় কী দেখতে চান, কীভাবে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যকে তাঁদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। বনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কীভাবে পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, সেই বিষয়টিও উঠে আসে।
জীবিকা ও স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি
এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হল, স্থানীয় মহিলাদের প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে তাঁদের জন্য বিকল্প জীবিকা ও স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি করা। ভবিষ্যতে তাঁরা যাতে প্রকৃতিপথ প্রদর্শক বা নেচার গাইড হিসেবে কাজ করতে পারেন, হোমস্টে পরিচালনা, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প কিংবা অন্যান্য পর্যটনভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারেন, সেই সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেলে বনকে কেন্দ্র করে তাঁদের আয়ের নতুন পথ খুলে যেতে পারে।
কর্মসূচিতে স্কুলছাত্রীরাও
কর্মসূচিতে স্কুলছাত্রীদের অংশগ্রহণও বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁদের বন, বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। স্থানীয় বন ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান ভবিষ্যতে প্রকৃতি পর্যটন এবং বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আলোচনায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা তাঁদের বর্তমান জীবিকা, বিভিন্ন সমস্যা এবং আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে মতামত জানান। বনদপ্তরের আধিকারিকরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনের কথা শোনেন। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বনদপ্তরের বিশ্বাস ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ
উৎসবের মরশুমে ডুয়ার্সের লাটাগুড়ি ও গরুমারায় পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। এই অঞ্চলের পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে পর্যটনের প্রসারের পাশাপাশি বন ও বন্যপ্রাণের সুরক্ষা এবং বনাঞ্চলের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। সেই সঙ্গে বনাঞ্চলের প্রান্তবর্তী মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন সংরক্ষণ, দায়িত্বশীল পর্যটন এবং মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা—এই তিনটি বিষয়কে একসূত্রে গেঁথে লাটাগুড়িতে বন দফতরের এই উদ্যোগ এক ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
স্থানীয় মহিলাদের বন সংরক্ষণের সক্রিয় অংশীদার করে তোলা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে জীবিকার সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করাই এই কর্মসূচির মূল ভাবনা। বনকে রক্ষা করার পাশাপাশি বনকে ঘিরে মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করাই এই উদ্যোগের সার্থকতা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)