জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: চোরবাগান সার্বজননীনের পুজোয় মহাবিপর্যয়! বৃষ্টির সপ্তমী সন্ধ্যায় হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের প্রাণ গিয়েছে। আর এই ঘটনায় এবার কলম ধরলেন তসলিমা নাসরিন। ফেসবুকে লম্বা পোস্ট করেছেন পুরস্কারজয়ী লেখিকা। তাঁর অন্য়তম প্রিয় শহরের শ্রেষ্ঠ উত্সবে যেভাবে তাল কেটেছে, তা তসলিমার বুকে দোলা দিয়েছে। তাঁর পোস্ট পড়লেই তা স্পষ্ট। এই মুহর্তে তসলিমা রয়েছেন দিল্লিতে। রবি সকালেই তিনি এই মর্মান্তিক খবরটি পেয়েছেন।
তসলিমার ফেসবুক পোস্ট হুবহু নীচে দেওয়া হল:
'একটু আনন্দ করতে বেরিয়েছিল মানুষগুলো। আলো দেখবে, মণ্ডপ দেখবে, শিল্পীদের কাজ দেখে মুগ্ধ হবে। তারপর বাড়ি ফিরবে। এই সামান্য আনন্দটুকুর জন্যও মানুষকে প্রাণ দিতে হলো! কলকাতার চোরবাগানের পুজোয় ভিড়ের চাপে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত উনিশ জন—আজ সকালের খবরে এই সংখ্যা। সংখ্যাটা পড়ছি, অথচ সংখ্যার পেছনের মানুষগুলোর কথা ভেবে বুকের ভেতর কেমন করছে। প্রত্যেকের একটি নাম ছিল, একটি ঘর ছিল, ভালবাসার মানুষ ছিল। আগামীকাল কী করবে, তারও কোনও না কোনও পরিকল্পনা ছিল। তেরো বছরের প্রাঞ্জল বাবা-মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে এসেছিল। ভিড়ের চাপে তাঁদের কাছ থেকে ছিটকে পড়ে আর উঠতে পারেনি। উনিশ বছরের প্রিয়া বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল। বাড়ি ফেরা হলো না তারও। তেরো বছর। উনিশ বছর। বয়সগুলো লিখতেই হাত থেমে যায়। কতটুকু দেখেছিল পৃথিবীর? কতটুকু বেঁচেছিল? ভাবছি সেই বাবা-মায়ের কথা। সন্তানকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন, সন্তানকে নিয়ে ফিরতে পারলেন না। যে হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে হাঁটছিলেন, সেই হাত আর কোনওদিন ধরতে পারবেন না। বাকি জীবন কতবার মনে পড়বে সেই মুহূর্ত! কতবার মনে হবে, আর একটু শক্ত করে ধরে রাখলে! অথচ সন্তানকে উৎসব দেখাতে নিয়ে যাওয়া কোনও অপরাধ নয়। নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারার বিশ্বাসটুকু মানুষের থাকতেই হবে।বাড়িতে পড়ে থাকবে তাদের জামাকাপড়, বইখাতা, রোজকার ব্যবহারের জিনিস। মানুষটি থাকবে না। তার ফোনে পুরোনো ছবি থাকবে, পুরোনো কথা থাকবে। নতুন কোনও কথা আসবে না। এই না-থাকাকে সঙ্গে নিয়ে স্বজনদের প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠতে হবে, খেতে বসতে হবে, রাত পার করতে হবে। আমরা অন্য খবরে চলে যাব। তাঁরা কোথায় যাবেন? মণ্ডপে কতজন ঢুকতে পারবেন, বিপদ হলে কোন পথে বেরোবেন, অসুস্থ কাউকে কীভাবে উদ্ধার করা হবে—এসবের দায়িত্ব যাঁরা নিয়েছিলেন, তাঁরা তো নিশ্চয়ই জানাবেন কোথায় ত্রুটি হয়েছিল। মৃতদের পরিবারকে সাহায্য করতে হবে, আহতদের চিকিৎসা দিতে হবে। তারপরও যে ক্ষত রয়ে যাবে, তার কোনও ক্ষতিপূরণ হয় না। কোনও অঙ্ক দিয়ে মায়ের পাশে সন্তানকে ফিরিয়ে বসানো যায় না। আগামী বছর আবার পুজো আসবে। আবার আলো জ্বলবে, ঢাক বাজবে, মানুষ পথে নামবে। এই পরিবারগুলোর কাছে পুজো আসবে সেই ভয়ংকর সন্ধ্যাটি নিয়ে। আনন্দের শব্দ শুনেও তাদের মনে পড়বে শেষ চিৎকার, শেষ দেখা মুখ, ছেড়ে যাওয়া হাত। এবার উৎসবের মধ্যে একটু জায়গা থাকুক তাঁদের কান্নার জন্য। একটু নীরবতা থাকুক যারা ফিরল না, তাদের জন্য।ওরা তো শুধু পুজো দেখে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল।'
তসলিমার তিলোত্তমায় ফেরা
গত অগাস্টে তসলিমা প্রায় দু'দশক পর কলকাতায় ফিরেছিলেন। 'সেক্যুলার মিশন' সংগঠনের আয়োজনে এক সাহিত্য অনুষ্ঠানের প্রধান মুখ হয়েই শহরে ফেরা হয়েছিল তাঁর। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। বামফ্রন্ট আমলে বাংলা থেকে বিতাড়িত তসলিমার বিজেপি জমানায় প্রত্যাবর্তন। বারবার তিনি এই শহরে ফিরতে চেয়েছিলেন। বারবার বলেছেন এই শহরের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)