বিধান সরকার: চোখের সামনে বন্ধুর মৃত্যু,নতুন জীবন ফিরে পেলেও আতঙ্ক কাটছে না বৈদ্যবাটির শুভাঙ্গীর। চোরবাগানে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যবাটির মালির বাগানের বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দারের। বৈদ্যবাটি থেকে ৮ জন মিলে গতকাল ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল তারা। সকাল সাড়ে নটা নাগাদ শ্রীপর্ণা, শুভাঙ্গী, দোয়েল আর ঋষি টোটোয় করে শেওড়াফুলি স্টেশনে যান। বৈদ্যবাটি চ্যাটার্জি পাড়া থেকে আরেক বান্ধবী তিয়াসা দাস ও তার এক পিসির মেয়ে, জ্যেঠুর ছেলে আর তার এক বন্ধু এই মোট আটজন একসঙ্গে ট্রেনে করে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন।
সারাদিন ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যেবেলায় তারা পৌঁছন চোরবাগানে। সেখানে একটি রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া করেন শ্রীপর্ণা-শুভাঙ্গীরা। বাকি চারজন আহিরীটোলার দিকে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে যান। খাওয়া-দাওয়া শেষে চোরবাগান মন্ডপে প্রবেশ করেন শ্রীপর্ণা ও শুভাঙ্গী, দোয়েল ঋষি একটু পিছিয়ে পড়েন। ঋষি হায়দ্রাবাদে থাকেন তার সঙ্গে দোয়েলের বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়েছে। সেই বিয়ের নিমন্ত্রণ করতেই কলকাতায় আসে এবং ঠাকুর দেখতে বেরোয়।
শুভাঙ্গীর বাবা শোভন রায় জানান, মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে প্রত্যেক বছরই কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যায়। শ্রীপর্ণার সঙ্গে ক্লাস এইট থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে। বৈদ্যবাটির সুরেন্দ্রনাথ বালিকা বিদ্যালয়ে। শুভাঙ্গী টিসিএসে চাকরি করে আর শ্রীপর্ণা টাটা ক্যান্সার হাসপাতালে। দুজনের অফিস নিউটাউনে। শ্রীপর্ণা বাড়িতে এলেই শুভাঙ্গীর সঙ্গে দেখা করতে আসত। গল্প করত।
চোর বাগানের মণ্ডপের ভেতর ঢুকে ওদের ঠাকুর দেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক বেরোনোর সময় একটা হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং কয়েকজন নিচে পড়ে যায়। শুভাঙ্গীর ঠিক পিছনেই ছিল শ্রীপর্ণা। শুভাঙ্গী পড়ে গেলে তাকে হাত ধরে টেনে সরিয়ে নেয় দুজন। শ্রীপর্ণা নিচে পড়ে যায়। পদপৃষ্ঠ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। শুভাঙ্গী মন্ডপের বাইরে দাঁড়িয়ে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে যখন তাকে খুঁজে পান, দেখেন নিথর হয়ে রয়েছে শ্রীপর্ণার দেহ।
ততক্ষণে তাদের কাছে এসে পৌঁছে গেছে দোয়েল আর ঋষি। তিনজনে মিলে পুলিসের গাড়ি করে শ্রীপর্ণাকে তুলে মেডিকেল কলেজে পৌঁছন তারা। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, শ্রীপর্ণা নেই। তবুও তার বন্ধুরা চিকিৎসককে বারবার দেখতে বলেন। থিমের মন্ডপে ঘুটঘুটে অন্ধকার পাকদন্ডী দিয়ে ঠাকুরের কাছে পৌঁছনো। তারপর সেখান থেকে বেরোনোর রাস্তা ছিল অপ্রশস্ত। মন্ডপ থেকে বেরোনোর দশ ফুট আগে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
শুভাঙ্গীর মামা সে সময় কলকাতাতেই ছিলেন। দিদির কাছ থেকে খবর পেয়ে মেডিকেল কলেজে পৌঁছে যান সেখান থেকে ভাগ্নিকে নিয়ে বৈদ্যবাটিতে ফেরেন। গত বছরও দুই বন্ধু মিলে একসঙ্গে ঠাকুর দেখেছেন শুভাঙ্গী-শ্রীপর্ণারা। এবারে সেই ঠাকুর দেখতে গিয়েই বন্ধুকে হারিয়ে বাড়ি ফিরেছেন শুভাঙ্গী। একদিকে আতঙ্ক অন্যদিকে, বন্ধুকে হারানোর শোকে মুহ্যমান শুভাঙ্গী ক্যামেরার সামনে কিছু বলতে চাননি।
তবে তিনি জানান, আগেও ঠাকুর দেখতে গেছেন কলকাতায়। অনেক বড় মণ্ডপে ঘুরেছেন। কিন্তু এরকম অব্যবস্থা চোখে পড়েনি। তারা যখন মণ্ডপে ঢুকছিলেন তখন ঝিরঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। মণ্ডপের ভেতরে একসঙ্গে অনেক লোক ঢুকে যাওয়া তাদের বের করার জন্য পিছন থেকে ঠেলাঠেলি হচ্ছিল। আর সেই ধাক্কাধাক্কিতেই কিছু লোক পড়ে যান। ঘটনায় তার ব্যাগ মোবাইল হারিয়ে গিয়েছে। বাড়ির সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেননি সেই মুহূর্তে। পরে এক বন্ধুর থেকে ফোন নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। শুভাঙ্গীর বাবা শোভন বাবু বলেন, মেয়েকে আর কোনদিন কলকাতায় ঠাকুর দেখতে পাঠাবো না। রাত থেকে ঘুমোতে পারিনি দুশ্চিন্তায়। আমারই মেয়ের মত ছিল শ্রীপর্ণা। তার জন্য মন খারাপ বলে বোঝাতে পারব না। আমার মেয়ে নতুন জীবন পেয়েছে,আর এই ঘটনা ভাবলে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)