৭.৪০ এ চোরবাগানের মণ্ডপে ঠিক কী হয়েছিল? ৪০ মিনিট দমবন্ধ, স্বজনহারানো প্রত্যক্ষদর্শীর গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিজ্ঞতা
Chorbagan Stamped: বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গিয়ে চোরবাগান সর্বজনীন মণ্ডপে চরম পদপিষ্টের ঘটনা। মৃত্যু অন্তত ১৭ জনের, হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রী। অব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফুঁসছে শহর।
জি ২৪ ঘন্টা ডিজিটাল ব্যুরো: শারদোৎসবের মহামায়া বরণের আনন্দ মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ঢেকে গেল মৃত্যুর কালো ছায়ায়। সপ্তমীর সন্ধ্যায় জমজমাট ঠাকুর দেখার মাঝেই বিখ্যাত চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের (Chorebagan Sarbojanin Durgotsab) মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে একসঙ্গে শয়ে শয়ে দর্শনার্থী মণ্ডপের ভেতরে ঢুকতে গেলে হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কিতে ঘটে যায় এই ভয়াবহ বিপর্যয়। এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পদপিষ্ট হয়ে এবং দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৭ জন দর্শনার্থীর। আহত হয়েছেন বহু মানুষ, যাঁদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এমনকি ভিড়ের চাপে কর্তব্যে থাকা এক পুলিস আধিকারিকও সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এবং আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নিতে ইতোমধ্যে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (Kolkata Medical College and Hospital - MCH) পৌঁছেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ঠিক কী ঘটেছিল চোরবাগান মণ্ডপে?
উদ্যোক্তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক প্রবেশের ব্যবস্থা রেখেছিলেন দাবি করলেও, বৃষ্টির তোড়ে সেই নিয়ন্ত্রণ মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত জনস্রোতের চাপে মণ্ডপের একটি অংশ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে বলে জানান উদ্যোক্তা প্রীতম সরকার। মণ্ডপের ভেতরে আলো কম থাকায় দৃশ্যমানতা (Low Visibility) কম ছিল। তার ওপর ভেতরে ঢোকা এবং বেরোনোর জন্য একটিই মাত্র সংকীর্ণ পথ থাকায় পেছনের মানুষের চাপে সামনের দর্শনার্থীরা ভারসাম্য হারিয়ে একে অপরের ওপর পড়ে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীর শিউরে ওঠা বর্ণনা
সেই মুহূর্তে মণ্ডপে উপস্থিত এক যুবক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়ে তাঁরা ওই মরণফাঁদে পড়েন। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। সামনের দিকে মানুষ এগোতে না পারলেও পেছন থেকে তীব্র ধাক্কা আসে। সামনের মানুষজন মাটিতে পড়ে যেতেই পেছনের লোকজন তাঁদের পিঠের ওপর আছড়ে পড়তে থাকেন।
ওই যুবকের কথায়, 'আমার সঙ্গে তিন বন্ধু ছিল। তিনজনই মানুষের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। আমার এক বান্ধবী সবচেয়ে নিচে ছিল। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট ধরে সে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। ওপরে এত মানুষের ভার ছিল যে টেনে বের করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। হাত ও ঘড়ি ধরে মানুষ বাঁচার জন্য আঁকড়ে ধরছিল। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা মণ্ডপের পাশের কাপড় ও ব্যারিকেড ভেঙে ফাঁকা জায়গা তৈরি করলে কোনওমতে টেনে বের করা সম্ভব হয়।'
কোথায় ছিল পুলিস ও অ্যাম্বুল্যান্স?
এত বড় এক ঐতিহ্যবাহী পুজোয় বিপর্যয় মোকাবিলা ও আপৎকালীন ব্যবস্থার অভাব নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় দুর্ঘটনার সময় কোনও অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা ছিল না। হাজার হাজার ভলান্টিয়ার বা পুলিসের যে তৎপরতা থাকার কথা ছিল, দুর্ঘটনার প্রাথমিক মুহূর্তে তা পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়। মাইকে বিভ্রান্তিকর ঘোষণার কারণে আতঙ্ক (Panic Stampede) আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। পরে স্থানীয় যুবকরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আহত ও নিথর দেহগুলিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর কাজ শুরু করেন।
পরবর্তীকালে লালবাজার কন্ট্রোল রুম থেকে অতিরিক্ত পুলিস বাহিনী, দমকল বাহিনী এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ (DMG) ঘটনাস্থলে পৌঁছে গোটা এলাকা কর্ডন করে। মৃত ও নিখোঁজদের স্বজনদের জন্য লালবাজারের তরফে হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে: ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮ এবং ০৩৩-২২১৪১৩১০। সপ্তমীর আনন্দকে চিরতরে মুছে দেওয়া এই ১৭টি তরতাজা প্রাণের অকালমৃত্যুর দায় কার-- পুজো উদ্যোক্তাদের অব্যবস্থা নাকি পুলিস প্রশাসনের ব্যর্থতা-- সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে।
আরও পড়ুন: সপ্তমীর সন্ধ্যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা! চোরবাগানের পুজোয় পদপিষ্ট হয়ে মৃত ১৭! জানালেন মুখ্যমন্ত্রী