দেবব্রত ঘোষ: চোরবাগানের কালো ছায়া হাওড়াতেও। বা, বলা ভালো ঠিক, হাওড়াতেও নয়, কালো ছায়া পৌঁছল বিহারেও। শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন পূজা কমিটির পুজো দেখতে গিয়েছিল বালি আনন্দনগরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী আকৃতি কুমারী (১৭)। তার সঙ্গে ছিলেন তার মামা-মামী, দিদি এবং আরও একজন। তাঁরা বিহারের গয়া থেকে কলকাতার পুজো দেখতে এসেছিলেন।
আরও পড়ুন: চোরবাগানে কেন এবং কীভাবে ঘটে গেল এত বড়
'আকৃতি আর নেই'
এই প্রথম কলকাতায় ঠাকুর দেখতে আসা তাঁদের। সঙ্গে ছিল ভিআইপি পাস। একমুখ হাসি আর একরাশ আনন্দ নিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ আকৃতি কুমারীর পরিবারের সদস্যরা ঠাকুর দেখতে বের হন। কিন্তু কিছু পরে খবর আসে-- আকৃতি আর নেই! পুজো মণ্ডপে ভিড়ের চাপে ঠেলাঠেলি এবং পদপিষ্টের ঘটনায় মৃত্যু হয়। আজ, রবিবার সকালে এই মৃত্যুর খবর চাউর হতেই প্রতিবেশীরা এবং আত্মীয়-স্বজনেরা ওই বাড়িতে ভিড় করেন। মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কান্না থামছে না। তাঁরা ঠিক মতো কথা বলার অবস্থায় নেই।
আর কেউ রাখি পরাবার রইল না!
পরিবারের এক সদস্য জানিয়েছে, তার নিজের কোনও বোন নেই, আকৃতি প্রতি বছর তাকে রাখি পরাত। এখন আর তাকে রাখি পরানোর কেউ রইল না! এই মৃত্যুর জন্য আকৃতির পরিবার পুজো কমিটির গাফিলতিকেই দায়ী করছেন। প্যান্ডেলে ঢোকা এবং বেরনোর রাস্তা সরু হওয়ার কারণে এই দুর্ঘটনা। তাঁরা চান এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হোক। দোষী যেন শাস্তি পায়।
আনন্দ লহমায় বিষাদ
আনন্দ লহমায় বদলে গেল বিষাদে! ১৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু। শোকের ছায়া দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা বিষ্ণুপুর থানার অন্তর্গত বাখরাহাটেও। বাখরাহাট ১১ গ্রাম দাসপাড়ার বাসিন্দা স্নেহা ভান্ডারী তার বোন নেহা ভান্ডারীকে নিয়ে গতকাল শনিবার দুপুর ১টা নাগাদ কলকাতার ঠাকুর দেখতে বের হন। তার পর ঘটে গিয়েছে বিপুল ঘটনা। কলকাতায় পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে নেমেছে মানুষের ঢল, সঙ্গে সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ নেমেছে বৃষ্টি! আর এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছে চোরবাগানের সেই ভয়াবহ ঘটনা। রাত্রি সাড়ে আটটা নাগাদ স্নেহা ভান্ডারীর বাড়িতে খবর আসে, স্নেহা শ্বাসকষ্ট নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেখানেই মারা গিয়েছেন! পুজো দেখতে বেরিয়ে এ কী মর্মান্তিক দুর্ঘটনা!
তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী স্নেহা
স্নেহা ভান্ডারীর বাবা পেশায় টোটো চালক। নাম শান্তি ভান্ডারী। মেয়ের খবর আসার পরে শান্তির বাড়িতে শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েন সকলে। ঠিক কী ঘটেছিল চোরবাগানের প্যান্ডেলে? চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়ে প্যান্ডেলের মধ্যে স্নেহার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্সে খবর দেওয়া হয়। অ্যাম্বুল্যান্স আসে। স্নেহাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে বলে জানা যায়। স্নেহা ভান্ডারী বিদ্যানগর কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পাশাপাশি বিদ্যানগরে একটি কম্পিউটার সেন্টারে কাজও করতেন তিনি।
চোরবাগানে মহা বিপর্যয়
চোরবাগানের এত বড় পুজোর আয়োজন, এত ভিড়! কিন্তু কীরকম ছিল তাদের ব্যবস্থাপনা? জি ২৪ ঘণ্টার প্রতিনিধি গিয়ে যা দেখলেন তাতে তো চক্ষু চড়কগাছ। পুজোমণ্ডপে ঢোকার পথ অসম্ভব সরু। তাছাড়া, সব চেয়ে বড় বিপদের কথা হল-- সরু এগজিট। তার উপর ওই সরু স্পেসেই একের পর এক স্টল। তাই কি পুজো উদ্যোক্তাদের ভিড়-লোভের বলি হলেন অসহায় ১৯? চোরবাগানে গতরাতের অভিশপ্ত সেই সময়ে বৃষ্টি হচ্ছিল। আচমকা সেই বৃষ্টিতে দর্শনার্থীদের অনেকেই হয়তো মণ্ডপ ছেড়ে বেরোতে চাইছিলেন না। এদিকে অসংখ্য লোক ঢুকছেন এবং আরও অসংখ্য ঢুকতে চাইছিলেন। সেই সময়ে পুজো কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে, প্যান্ডেল ছেড়ে বেরিয়ে যান, মণ্ডপের অবস্থা ভালো নয়, মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে! ব্যস! এই কথাতেই মহা কাণ্ড ঘটে যায়। প্যান্ডেলের ভিতরে থাকা মানুষজন হুড়োহুড়ি ফেলে দেন। আগে বেরোতে চান। চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি
গতকালের চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনার পর কলকাতায় জমায়েত ও মিছিল ঘিরে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করল কলকাতা পুলিস। গতকালের স্ট্যাম্পিডের ঘটনার পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে কলকাতা পুলিসের কমিশনার অজয় নন্দের নির্দেশে এই নিষেধাজ্ঞা জারি। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS), ২০২৩-এর ১৬৩ নম্বর ধারার অধীনে এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ১৮ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত, অর্থাৎ, তিন দিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে অথবা পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)