SOCIAL MEDIA

Newsletter

PARTNER SITES
Select Language Select State

বামাক্ষ্যাপাকে নামিয়ে দেওয়ার পর থমকে গিয়েছিল ট্রেন! ইকরার মন্দিরে আজও পোঁতা সাধকের ত্রিশূল

তারাপীঠের মা তারার মন্দিরের জন্য জমি দান করেছিলেন জামুড়িয়ার ইকরার জমিদার ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায়ও। বামদেবের সঙ্গে তাঁর পরিবারের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। ট্রেন থমকে যাওয়ার অলৌকিক জনশ্রুতি থেকে শিবমন্দিরে ত্রিশূল পুঁতে মা তারার আরাধনার নির্দেশ—শিল্পাঞ্চলের বুকেও আজও অমলিন সেই সাধকের স্মৃতি।

Written By Debasmita Das
Published: Nov 04, 2026, 01:02 PM IST | Updated: Nov 04, 2026, 01:27 PM IST
Join

বাসুদেব চট্টোপাধ্যায়: দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালি মেতে ওঠে কালীপুজো ও দীপাবলির উৎসবে। আর এই উৎসবের আবহেই আসানসোলের জামুড়িয়ার ইকরায় মহেশমুড়া গ্রামে ফিরে আসে এক সাধককে ঘিরে থাকা বিস্ময়কর কাহিনি। তিনি তারাপীঠের সাধক বামাক্ষ্যাপা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে মুখে প্রচলিত, এক সময়ে এই শিল্পাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর। কখনও তারাপীঠ, কখনও বৈদ্যনাথ ধাম, -সাধনার টানে এই অঞ্চলের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন বামদেব। ইকরার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে ঘিরে আজও সবচেয়ে বেশি চর্চা হয় দুটি ঘটনা নিয়ে। একটি ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর ট্রেন না চলার অলৌকিক জনশ্রুতি, অন্যটি তাঁর হাতে থাকা ত্রিশূল পুঁতে দিয়ে মা তারার আরাধনার নির্দেশ।

স্থানীয় প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একবার ট্রেনে চেপে তারাপীঠের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন বামাক্ষ্যাপা। জামুড়িয়া এলাকায় টিকিট পরীক্ষকেরা তাঁর কাছে টিকিট দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। অভিযোগ, এর পর তাঁকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তার পরেই ঘটে যায় আশ্চর্য ঘটনা! জনশ্রুতি, বামদেবকে নামিয়ে দেওয়ার পর ট্রেন আর এক চুলও এগোয়নি। রেলের আধিকারিকেরা বিষয়টি বুঝতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন। খুঁজতে খুঁজতে ইকরায় মহেশমুড়ায় পৌঁছে সাধকের কাছে ক্ষমা চান তাঁরা। ফের তাঁকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার পরেই নাকি চলতে শুরু করে ট্রেন। এই ঘটনার কোনও লিখিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে ইকরার মানুষের মুখে মুখে কয়েক প্রজন্ম ধরে বেঁচে রয়েছে এই কাহিনি।

আরও পড়ুন, কথিত আছে এখানেই পড়েছিল সতীর বাম পায়ের অংশ, বিশ্বাস আর রহস্যে ঘেরা প্রাচীণ ভ্রামরী মন্দির

জমিদার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের ইতিহাস 

ইকরার এই জনশ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় জমিদার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের ইতিহাসও। পরিবারের সদস্যদের কথায়, ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বামদেবের অন্যতম ভক্ত। ইকরার ওই জমিদারবাড়িতে সাধকের যাতায়াত ছিল। শুধু ইকরাতেই নয়, তারাপীঠের সঙ্গেও এই পরিবারের সম্পর্কের কথা জানা যায়। মা তারার মন্দিরের জন্য যাঁরা জমি দান করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন জামুড়িয়ার ইকরার ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায়ও। পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য চিত্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, আজও তারাপীঠের মন্দিরে তাঁদের পরিবারের নামে মা তারাকে ভোগ নিবেদন করা হয়। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই স্মৃতি তাঁদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

ঋষিকেশবাবুর ইচ্ছা ছিল, ইকরার নিজের বাড়িতেই মা তারার একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু বামাক্ষ্যাপা তাঁকে সেই পরামর্শ দেননি। কারণ, ওই বাড়িতে আগে থেকেই ছিল বাসন্তী দেবীর মন্দির। পাশাপাশি নিয়মিত হত জগদ্ধাত্রী পুজো। তাই সেখানে নতুন করে মা তারার মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না বলেই মত দিয়েছিলেন বামদেব। কিন্তু ভক্ত ঋষিকেশবাবু নিজের ইচ্ছায় অনড় থাকায় বাড়ির পাশের একটি শিবমন্দিরের স্থান দেখিয়ে দেন সাধক। জনশ্রুতি, নিজের হাতে থাকা ত্রিশূলটি সেই শিবমন্দিরে পুঁতে দিয়ে বামদেব নির্দেশ দিয়েছিলেন, এখানেই যেন মা তারার আরাধনা করা হয়। সেই ত্রিশূল আজও মন্দিরে রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। দেওয়ালীর সময় কালীপুজো হয় ধুমধামে।

বর্তমানে ইকরার মহেশমুড়ার বামদেবের ওই মন্দিরে মা তারার পুজোর দায়িত্ব সামলান গ্রামেরই বাসিন্দা শশী চট্টোপাধ্যায়। রয়েছে একটি পুকুর, বামদেবের স্মৃতিবিজড়িত ওই স্থানে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো-অর্চনা করে আসছেন তিনি। প্রতি বছর দীপাবলির দিন কালীপুজোর বিশেষ আয়োজন ঘিরে এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আবহ। ভক্তদের সমাগমে ধুমধাম করে সম্পন্ন হয় পুজো। কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পরম্পরাই ধরে রেখেছে ইকরার ধর্মীয় ঐতিহ্য।

কারখানার ধোঁয়ার আড়ালেও অমলিন সাধকের স্মৃতি 

সময়ের সঙ্গে আমূল বদলে গিয়েছে ইকরা গ্রামের চেহারা। এক সময়ে যেখানে ছিল জঙ্গল, ফাঁকা জমি আর নির্জন পরিবেশ, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্পাঞ্চল। চারদিকে একের পর এক কারখানা। শিল্পের প্রসারের সঙ্গে বেড়েছে দূষণের মাত্রাও। হারিয়ে গিয়েছে পুরনো গ্রামের অনেক চেনা পরিবেশ। যে এলাকায় এক সময়ে সাধনার পরিবেশ ছিল বলে স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, আজ সেখানে শিল্পের ব্যস্ততা আর কারখানার ধোঁয়া। কিন্তু যন্ত্রের শব্দ, দূষণ আর নগরায়ণের চাপেও হারিয়ে যায়নি বামাক্ষ্যাপাকে ঘিরে থাকা মানুষের বিশ্বাস।

আরও পড়ুন, 'তুই আমাকে এখানে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা কর', স্বপ্নাদেশ পান রাজা কনদর্পনারায়ণ

ইতিহাসের পাতায় হয়তো ইকরার এই অলৌকিক ঘটনাগুলির কোনও লিখিত প্রমাণ নেই। কিন্তু স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে, চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বংশপরম্পরায় চলে আসা কাহিনিতে এবং শিবমন্দিরে থাকা সেই ত্রিশূলকে ঘিরে আজও বেঁচে রয়েছে সাধক বামদেবের স্মৃতি। তাই জামুড়িয়ার ইকরায় কালীপুজো শুধুই একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, কয়েক প্রজন্মের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং এক সাধকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সম্পর্কেরও স্মারক।

(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)

Add Zee News as a Preferred Source
TAGS:

About the Author

৮ বছর আগে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে হাতেখড়ি। ক্যামেরার সামনে অথবা ডেস্ক-- সমান সাবলীল। বিনোদন দুনিয়ায় সাংবাদিকতার শুরু। ক্রমে নিজের আগ্রহের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাজনীতি, ক্রাইম, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। বিশ্বাস, ডিজিটাল সাংবাদিকতা এখন মার্কেটিং ও প্যাকেজিং। 

ZEENEWS TRENDING STORIES