জেলেদের জালে উঠে এসেছিল অদ্ভুত দর্শন এক পাথর! এই কি সেই অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী মহিষমর্দিনী?
Sarvamangala Temple Durga Puja: মন্দিরে এল মায়ের ঘট, শুরু হল দুর্গাপুজো। ঘট উত্তোলন ও জল ভরার মধ্য দিয়ে এভাবেই রাঢ়বঙ্গে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা ঐতিহ্যবাহী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে। মহালয়ার পরের দিন ঐতিহাসিক কৃষ্ণসায়রের চাঁদনি ঘাট থেকে রূপোর ঘটে জল ভরে সুসজ্জিত শোভাযাত্রার মাধ্যমে মন্দিরে আনা হল মায়ের ঘট।
অরূপ লাহা: রীতি মেনে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এল মায়ের ঘট, বর্ধমানে শুরু দুর্গাপুজো। ঘট উত্তোলন ও জল ভরার মধ্য দিয়ে রাঢ়বঙ্গে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হল বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে। মহালয়ার পরের দিন ঐতিহাসিক কৃষ্ণসায়রের চাঁদনি ঘাট থেকে রূপোর ঘটে জল ভরে সুসজ্জিত শোভাযাত্রার মাধ্যমে মন্দিরে আনা হয় মায়ের ঘট। ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে ভক্তদের শোভাযাত্রা ঘিরে উৎসবের আবহ তৈরি হয় মন্দির চত্বরে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, এই ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই বর্ধমান শহরে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। নবমী পর্যন্ত চলবে দেবী সর্বমঙ্গলার পুজো।
আরও পড়ুন: মহাকালী কালীকুমারী নিত্যকালীর নামে সংকল্পেই চলেছে ২৭৬ বছরের আর্য-অনার্য সংস্কৃতির মেলবন্ধনের পুজো
ঐতিহ্য ও লোককাহিনি
বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও নানা লোককাহিনি। কথিত আছে, মহালয়ার পরের দিন দেবী সর্বমঙ্গলার জন্য ঘট আনার রীতি চলে আসছে বহু বছর ধরে। কৃষ্ণসায়র থেকে রথে চাপিয়ে জলপূর্ণ ঘট মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। এরপর সেই ঘট প্রতিষ্ঠা করে শুরু হয় পুজোর আচার-অনুষ্ঠান। এই প্রথাকে কেন্দ্র করে বর্ধমানের মানুষের মধ্যে বিশেষ আবেগ ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়।
মহারাজা কীর্তিচাঁদ
ঐতিহাসিকদের মতে, বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচাঁদ ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে সর্বমঙ্গলা মন্দির নির্মাণ করান। তবে মন্দিরের আরাধ্যা দেবী সর্বমঙ্গলার মূর্তিটি মন্দিরের থেকেও প্রাচীন বলে মনে করা হয়। মূর্তিটির প্রাচীনত্ব নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারও মতে, এটি প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো, আবার কারও মতে মূর্তিটির বয়স প্রায় দু’হাজার বছর।
কষ্টিপাথরের অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী
কষ্টিপাথরের তৈরি অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী মহিষমর্দিনী রূপে পূজিত হন দেবী সর্বমঙ্গলা। মূর্তিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৮ ইঞ্চি। দেবীর মূর্তিকে ঘিরে রয়েছে একাধিক প্রচলিত কাহিনি। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, বর্ধমানের বাহিরসর্বমঙ্গলা অঞ্চলে জেলেদের জালে উঠে এসেছিল অদ্ভুত দর্শন একটি পাথর। পরে এক পুরোহিত বুঝতে পারেন, সেটি আসলে দেবীমূর্তি। কথিত আছে, মূর্তিটি দামোদর সংলগ্ন একটি চুন তৈরির কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে শামুকের খোলের সঙ্গে পোড়ানো হলেও মূর্তিটির কোনও ক্ষতি হয়নি। এরপর স্বপ্নাদেশ পেয়ে বর্ধমানের তৎকালীন রাজা মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করে দেবী সর্বমঙ্গলা নামে পুজোর প্রচলন করেন।
ধর্ম ও সংস্কৃতি
জমিদারি প্রথার অবসানের পরে মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সামলাতে ১৯৫৯ সালে বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজা উদয়চাঁদ একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। বর্তমানে ওই বোর্ডের হাতেই মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে। রবিবাসরীয় সকালে ঘট উত্তোলনে উপস্থিত ছিলেন জেলার দুই মন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র ও ক্ষুদিরাম টুডু। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক শ্বেতা আগরওয়াল। বর্ধমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন এই সর্বমঙ্গলা মন্দির। এখানকার ঘট উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর সূচনা হওয়ায় মন্দিরের এই আচার শুধু ধর্মীয় রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বর্ধমানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জনজীবনের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)