পার্থ চৌধুরী: শহরের পুজোয় যখন থিমের চাকচিক্য আর আলোর রোশনাই, গ্রামের পুজোয় তখন লুকিয়ে রয়েছে এক অনাবিল স্নিগ্ধতা ও মাটির গন্ধ। গ্রামীণ বাংলার সেই হারিয়ে যাওয়া রূপ, লোকজীবনের পরম্পরা আর পুজোর চিরন্তন সৌন্দর্যকে তুলে ধরতেই গ্রামে-গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্বজিৎ হাজরা ও তাঁর দল। তাঁদের সংস্থার উদ্যোগে গত চার বছর ধরে আয়োজিত হয়ে আসছে এক অভিনব প্রতিযোগিতা 'দেখবো এবার গাঁয়ের ঠাকুর'।
১৯০ কিমি পথ, ১০টি গাড়ি, ৪০ জনের টিম
সকাল সাতটা থেকে রাত ন'টা-সাড়ে ন'টা পর্যন্ত পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ১৭০ থেকে ১৯০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে পৌঁছে যাচ্ছে এই দল। কখনও বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান, কখনও আবার গ্রামীণ বারোয়ারি বা ক্লাবের মণ্ডপ-- সব জায়গাতেই সন্ধান চলছে সাবেক ঐতিহ্যের। ঢাক, ঢোল, কাঁসি ও সানাইয়ের সুরে সেজে ওঠা ৮ থেকে ১০টি গাড়ির ট্যাবলো নিয়ে প্রায় ৪০ জনের এক বিশাল টিম গ্রামবাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চষে ফেলছে। ইতিমধ্যে এই দীর্ঘ পথচলায় শতাধিক পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের এই গবেষণা ও অন্বেষণমূলক প্রয়াস।
ঢাকের বোল, কাশের দ্যুতি
গ্রামের পুজোমণ্ডপগুলিতে দেখা মিলছে চিরাচরিত বাংলার ছবি-- মেয়েরা নিখুঁত হাতে আঁকছেন আলপনা, প্রাঙ্গণে চলছে কিশোরীদের ধামাইল ও সাবেক নৃত্য, ওদিকে শোনা যাচ্ছে ঢাকের বোল আর আকাশে কাশফুলের দ্যুতি। কোনও কোনও জায়গায় পরিবেশরক্ষায় পুজো উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে চারাগাছ ও স্মারক সম্মান।
ময়না ষষ্ঠীতলা
ময়না ষষ্ঠীতলাপাড়ার দুর্গা মন্দিরে গিয়ে দেখা গেল সেখানে আন্তরিক উৎসবের আবহ। পুজো কমিটির সদস্য রামগোপাল ঘোষ জানান, তাঁদের এই পুজো ১৫ বছরে পদার্পণ করেছে। বড় শহরের মতো চোখ-ধাঁধানো থিমের জৌলুস এখানে নেই, আছে নিখাদ ঘরোয়া পরিবেশ। ষষ্ঠীর অধিবাস থেকে শুরু করে তিন দিন ধরে চলে আবৃত্তি, গান, নাচ, কুইজ ও কলসি পাঠানোর মতো নানা বিনোদনমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গ্রামের ছোট থেকে প্রবীণ, বিশেষ করে মহিলারা এক হয়ে দশনার্থীদের আপ্যায়ন করেন।
আদি-অকৃত্রিম বাংলার পুজো
বিচারকদের এই সফর তাঁদের উৎসাহ ও আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি। সংস্থার প্রধান বিশ্বজিৎ হাজরা বলেন, থিমপুজোর ভিড়ে গ্রামের নিজস্ব ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং আন্তরিক উৎসবের আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে কি না, তা খুঁজে বের করতেই তাঁদের এই উদ্যোগ। শহর থেকে বহু দূরে গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে সাবেক প্রতিমা, লোকসংস্কৃতি আর মিলনের এই আবহ সত্যিই যেন বাংলার পুজোর আদি ও অকৃত্রিম রূপকে নতুন করে ফিরিয়ে আনছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)