মহালয়াতেই দেবীবন্দনা! সানাইয়ের সুর, নদীস্রোতে ভেসে আসা দ্বিভুজা দারুদুর্গার দ্যুতি; ৩৫০ বছরের প্রাচীন পুজো বাঁকুড়ায়
Bankura's Old Durga Puja: দুর্গা দ্বিভুজা। দুর্গা কাঠের, মানে, দারুপ্রতিমা। এখানকার চৌধুরীবাড়ির পুজো খুবই প্রাচীন। মহালয়াতেই দেবীবন্দনা। মহালয়ার পরের দিন থেকেই জমিদারবাড়ির চৌহদ্দিতে নহবতের সুর। যেখানে সংগীতের সুরে এসে মেশে ইতিহাস-ঐতিহ্য। কোথায়?
মৃত্যুঞ্জয় দাস: বাঁকুড়ার ওন্দায় চৌধুরীবাড়ির পুজো খুবই প্রাচীন। জমিদারের নামেই এ গ্রামের নাম দামোদরবাটি। জমিদারবাড়ির আনাচে-কানাচে ইতিহাসের লুকোচুরি। মহালয়ায় দেবীবন্দনা। মহালয়ার পরদিন থেকেই জমিদারবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে বেজে উঠে নহবতের সুর। আজও সেই সুর জানান দেয়, পুজো শুরুর আনন্দবার্তা। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের আগে স্বপ্ন পেয়ে নদীতে ভেসে যাওয়া নিম কাঠ তুলে তৈরি করা হয়েছিল দুর্গাপ্রতিমা। সেই নিম কাঠের দ্বিভুজা দুর্গা আজও জমিদারবাড়িতে পূজিতা হন।
কালস্রোত বনাম স্মৃতির টুকরো
কালের স্রোতে বিলীন হয়েছে জমিদার ও জমিদারি। ভাঙা চুন-সুরকির জমিদারবাড়ি মনে করিয়ে দেয় চৌধুরী জমিদারদারদের সেই বর্ণাঢ্য ইতিহাস। সেই ইতিহাসেরই এক টুকরো স্মৃতি জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো, যা আজও বাস্তব। আজও এখানে নিয়ম মেনেই দেবী আরাধনায় মেতে ওঠেন বর্তমান জমিদারবাড়ির সদস্যরা।
মল্লরাজার বন্ধুত্ব থেকে মহা সমৃদ্ধি
বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের চৌধুরী জমিদার দামোদর নারায়ণ চৌধুরী। তাঁর নাম অনুসারেই গ্রামের নামকরণ দামোদরবাটি। কথিত আছে, চৌধুরী পরিবারের আদি পুরুষ দামোদর গুহ বাংলাদেশের যশোরের জমিদার ছিলেন। বর্গীদের হাত থেকে বাঁচতে যশোর ছেড়ে হাজির হয়েছিলেন মল্লগড় বিষ্ণুপুরে। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা আশ্রয় দিয়েছিল ওই জমিদারকে। পরবর্তীকালে তাঁকে চৌধুরী উপাধি দেন মল্ল রাজারা। মল্লরাজাদের সৌজন্যে দামোদরবাটিতে পত্তন হয় চৌধুরী জমিদারদের জমিদারি। মল্লরাজারা চৌধুরী জমিদারদের প্রচুর জমিজায়গা দান করেন। দামোদর নারায়ণ চৌধুরীর সময়েই মল্লরাজাদের সৌজন্যে ফুলে-ফেঁপে ওঠে চৌধুরী জমিদারদের বহর। মল্লরাজারা ১৩টি মৌজা তালুক দান করেন চৌধুরী জমিদারদের। আর্থিক ভাবে চৌধুরী জমিদাররা সমৃদ্ধি লাভ করেন। দামোদরবাটিতে শুরু হয় চৌধুরী জমিদারদের বড় বড় বাড়ি নির্মাণ এবং নানান পুজো অর্চনা।
দারুপ্রতিমা
শোনা যায়, স্বপ্ন পেয়ে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী থেকে নিম কাঠ কুড়িয়ে পেয়ে সেই নিম কাঠ দিয়ে মা মৃন্ময়ীর আদলে দুর্গামূর্তি তৈরি করেন চৌধুরী পরিবারের বংশধর। তারপর থেকেই চৌধুরী পরিবারে শুরু হয় দুর্গাপুজা। পরিবারের দাবি, তাঁদের এই পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন। জমিদার বাড়ির ভাঙাচোরা বড়ো বড়ো বাড়ি আজও জানান দিচ্ছে তাঁদের ইতিকথা। ভাঙাচোরা, চুন সুরকি খসে-পড়া জরাজীর্ণ জমিদার বাড়ির অন্দরে রয়েছে দুর্গাদালান। সেখানেই প্রাচীন নিয়ম মেনে আজও দুর্গাদেবীর আরাধনায় মেতে ওঠেন জমিদার বাড়ির বর্তমান সদস্যরা। এখানকারর প্রতিমা একটু অন্য ধরনের। এখানে নিমকাঠের দেবী দুর্গা দ্বিভুজা। উপরে মহাদেব। দেবীর পাশে কার্তিক, গনেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী। মল্লরাজাদের মৃন্ময়ীর কাঠামো অনুরূপ চৌধুরী জমিদার বাড়ির দুর্গা। বৈষ্ণবমতে, পুজোপাঠ, সপ্তমাদি কল্পারম্ভে এখানে দেবীর আরধনা করা হয়। প্রাচীন তালাপাতার চণ্ডী পাঠ করা হয় জমিদার বাড়ির দুর্গাদালানে।
মেলা থেকে নস্টালজিয়া
দামোদরবাটি গ্রামের আদি দুর্গাপূজা চৌধুরী জমিদারদের এই পুজো। যা বড়ো মেলা নামেই পরিচিত। জমিদারদের হাতে গড়া পুজোতে এতটুকুও খামতি রাখতে চায় না পরিবারের সদস্যরা। পুজোর সময় যে যেখানেই থাকুক, শিকড়ের টানে ছুটে আসে পুজোর ক'টা দিন এক সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠতে। জমজমাট গল্প-আড্ডায় জমে ওঠে জমিদারবাড়ির দুর্গা দালান। পুজোর আনন্দের মধ্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয় পুরানো সেই দিনের কথা। মায়ের আরাধনার মধ্য দিয়ে খুশি ও আনন্দের মাঝে ফিরে আসে জমিদার বাড়ির সেই নস্টালজিয়া।
আরও পড়ুন: রাজকন্যার সঙ্গে খেলতেন বালিকা দুর্গা! রাজা রেগে গিয়ে একদিন পেয়াদা পাঠালেন, তারপরই
আরও পড়ুন: দুঃখ থেকে প্রতিজ্ঞা! সেদিন অপমানিত হয়ে না ফিরে
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)