চম্পক দত্ত: সরকারি প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠাতে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় প্রশাসনই সম্পূর্ণ ভরসা রেখেছে ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা ডিবিটি (Direct Benefit Transfer - DBT) ব্যবস্থার উপর। যার মূল স্তম্ভ ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন বা আধার সংযোগ (Aadhaar Seeding)। কিন্তু এই আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাতেই যদি বড়সড় ফাঁকফোকর তৈরি হয়, তবে তার খেসারত দিতে হয় সমাজের প্রান্তিক মানুষদের। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল পুরসভা এলাকায় অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য। নিজের বৈধ আধার নম্বর থাকা সত্ত্বেও মাসের পর মাস সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এক অসহায় বিধবা মহিলা; অথচ তাঁরই আধার নম্বর ব্যবহার করে অন্য এক অজ্ঞাতপরিচয় মহিলার অ্যাকাউন্টে নিয়মিত ঢুকে যাচ্ছে অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকা।
ঠিক কী ঘটেছে ঘাটালের আলমগঞ্জে?
ঘাটাল পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আলমগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ছায়া সোনকার। কিছুদিন আগেই স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। স্বামীহীন সংসারে নেমে এসেছে চরম আর্থিক অনটন, নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অন্নপূর্ণা প্রকল্পের অধীনে মাসিক ৩ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা পাওয়ার আশায় আবেদন করতে যান তিনি।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তথ্য নথিভুক্তকরণের সময়। পুরসভার দফতরে আবেদন খতিয়ে দেখার সময় জানা যায়, ছায়াদেবীর আধার নম্বর সিস্টেমে ইতোমধ্যেই অন্য এক উপভোক্তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি অনুদানের টাকা নিয়মিত সংশ্লিষ্ট অন্য মহিলার অ্যাকাউন্টে জমা পড়ছে। ফলে সিস্টেমে ‘ডুপ্লিকেট এন্ট্রি’ দেখিয়ে ছায়াদেবীর নাম নথিভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
দরজায় দরজায় চক্কর, মিলছে না সমাধান
সমস্যার সমাধানে দিনের পর দিন ঘাটাল পুরসভা থেকে শুরু করে মহকুমা শাসকের (Sub-Divisional Officer - SDO) দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ছায়াদেবী। জমা দিয়েছেন নিজের যাবতীয় নথিপত্র। কিন্তু প্রশাসনিক স্তরে ফাইল চালাচালি হলেও কোনও স্থায়ী সুরাহা মেলেনি। একদিকে উপার্জনের অভাব, অন্যদিকে প্রাপ্য সরকারি সহায়তা হাতছাড়া হওয়া-- দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে রীতিমতো দিশেহারা অবস্থা এই মহিলার।
সমস্যাটি কী ভাবে তৈরি হয়? (Techno-Administrative Glitch)
ডিবিটি (DBT) ব্যবস্থায় এই ধরনের ঘটনা সাধারণত দুটি প্রধান কারণে ঘটতে পারে:
তথ্য তোলার সময় ভুল (Data Entry Error): ব্লক বা পুরসভা স্তরে ডেটা এন্ট্রির সময় এক ডিজিটের ভুল টাইপিংয়ের কারণে এক উপভোক্তার আধার নম্বর অন্য কারও নামের সাথে পোর্টাল-এ ম্যাপ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু মারাত্মক ত্রুটি।
এনপিসিআই ম্যাপিং জটিলতা (NPCI Mapping & Seeding Issue): ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার (NPCI) ম্যাপিং সার্ভারে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট এবং আধার লিঙ্কিংয়ের সময় অসাবধানতাবশত মিসম্যাচ ঘটলে টাকা ভুল অ্যাকাউন্টে চলে যেতে পারে।
অসাধু চক্রের সক্রিয়তা (Potential Fraud)
কোনও অসাধু ব্যক্তি বা মধ্যস্বত্বভোগী অন্যের আধার তথ্য জালিয়াতি করে সরকারি পোর্টাল থেকে ফায়দা তুলছে কি না, তাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা
এই ধরনের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় প্রযুক্তিগত সাক্ষরতার অভাবে বহু মানুষ আধার লিঙ্কিংয়ের জটিলতায় বিভ্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে প্রশাসনের উচিত সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের মাধ্যমে সিস্টেমে দ্রুত ‘ম্যানুয়াল ডি-লিঙ্কিং’ (Manual De-linking) প্রক্রিয়া চালু করা এবং যে অ্যাকাউন্টে অবৈধভাবে টাকা ঢুকছে, তা স্থগিত করে প্রকৃত দাবিদার ছায়া সোনকারের নামে পুনরায় আবেদন কার্যকর করা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)