বিশ্বজিৎ মিত্র: তেঁতুল বটের কোলে দক্ষিণে যাও চলে, কিষাণ কোণে ঈশানী—কহে দিলাম নিশানি। গুপ্তধনের সন্ধান নয়, তবে এমন এক আশ্চর্য জিনিসের খোঁজ মিলবে, যা চোখে দেখলে বিস্ময়ে মন আর মুখ দুটোই বলে উঠবে—‘এও কি সম্ভব?’ কতটা উত্তরে বা কতটা দক্ষিণে, সেই হিসেব দেওয়ারও বিশেষ প্রয়োজন নেই। কারণ এলাকায় গিয়ে শুধু হদিস চাইলেই স্থানীয় মানুষজন দেখিয়ে দেবেন সেই আশ্চর্য স্থান। শিয়ালদহ-রানাঘাট রেলপথে চাকদহ ও পালপাড়ার মাঝামাঝি ছোট্ট একটি এলাকা—কেবিএম খোশবাস মহল্লা। সাধারণত ছুটি কাটাতে পর্যটকদের ভিড় এখানে খুব একটা দেখা যায় না। তবে তীর্থযাত্রীদের আনাগোনা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। কারণ একটাই—একটি রহস্যময় লাল তেঁতুল গাছ।
৪০০ বছরের পুরনো রহস্যময় লাল তেঁতুল!
দূর থেকে দেখলে আর পাঁচটা তেঁতুল গাছের মতোই। কিন্তু এই গাছের তেঁতুল পাড়ার পর ভাঙলেই দেখা যায় টকটকে লাল রং। চাকদহের খোশবাস মহল্লায় ৪০০ বছরের পুরনো রহস্যময় লাল তেঁতুল! আর সেই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই বছরের পর বছর ধরে মানুষের মনে তৈরি করেছে বিস্ময়, বিশ্বাস এবং নানা কৌতূহল। স্থানীয়দের দাবি, এই গাছটির বয়স প্রায় চারশো বছর। গাছটির অবস্থান যে জায়গায়, সেই স্থানটি পরিচিত ‘আজগুবি তলা’ নামে। কেন এমন নাম? তার পিছনেও রয়েছে নানা লোককথা। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, একসময় এই এলাকায় এমন কিছু ঘটনা ঘটত, যার সাধারণভাবে ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। সেই থেকেই নাকি জায়গাটির নাম হয় ‘আজগুবি তলা’। এই গাছকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি ধর্মীয় বিশ্বাস। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় এই অঞ্চলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। কথিত আছে, তেঁতুল গাছটির নিচে এক পীর বাবা বসবাস করতেন। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা ছড়িয়ে পড়েছিল বহু দূর পর্যন্ত। রোগ নিরাময়ের আশায় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতেন। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পর তেঁতুল গাছের নিচেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। সেই সময় থেকেই নাকি তেঁতুলের রং লাল হয়ে যায়—এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে এলাকায়।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
তবে বিশ্বাসের এই গল্পের পাশাপাশি রয়েছে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুখেন বিশ্বাস জানান, এই তেঁতুলের ফলের লাল রং অত্যন্ত বিরল। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী গাছটির বয়স প্রায় চারশো বছর বলে জানা যায়। লোকবিশ্বাসের পরম্পরা থেকে জানা যায় বিভিন্ন রকমের আজগুবি ঘটনা ঘটত যা সাধারণ দৃষ্টিতে মানুষ বিচার বিশ্লেষণ করতে পারত না।। তবে এই গাছের প্রকৃত বয়স এবং ফলের এমন বৈশিষ্ট্যের পিছনে কী কারণ রয়েছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে আরও অনুসন্ধানের বিষয়। অন্যদিকে কৃষিবিজ্ঞানীদের বক্তব্য, এর মধ্যে অলৌকিক বা ‘আজগুবি’ কিছু থাকার প্রয়োজন নেই। এটি তেঁতুলেরই একটি বিরল প্রজাতি বা বৈচিত্র্য হতে পারে। অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর কিছু এলাকাতেও এ ধরনের তেঁতুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বাংলায় এমন গাছ অত্যন্ত বিরল। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়ন্ত তরফদার-এর মতে, এই ধরনের গাছ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। তেঁতুলের যেমন বিভিন্ন উপকারিতা রয়েছে, তেমনই এই বিরল বৈশিষ্ট্যের গাছটি উদ্ভিদবৈচিত্র্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আরও আশ্চর্যের বিষয়, সাধারণ তেঁতুলের মতো এই তেঁতুলের স্বাদও একেবারে একই নয়। যেখানে সাধারণ তেঁতুল মূলত টক, সেখানে এই লাল তেঁতুলের স্বাদে রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা।
স্থানীয় বিশ্বাস
স্থানীয় মানুষ এই তেঁতুল সাধারণত খান না। বরং ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে গাছটিকে পূজা করেন। মানত পূরণের আশায় গাছের গায়ে ঢিল বেঁধে রাখেন অনেকে। চারশো বছরের পুরনো এই গাছ আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস আর বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত সংযোগস্থল হয়ে। কীভাবে চারশো বছর আগে এই তেঁতুলের ফলের রং এমন লাল হয়ে উঠল? কেন বাংলার অন্যত্র এমন গাছের দেখা মেলে না? এর পিছনে কি বিরল প্রজাতির বৈশিষ্ট্য, নাকি রয়েছে অন্য কোনও প্রাকৃতিক রহস্য? উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো আরও গবেষণা দরকার। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—চাকদহের খোশবাস মহল্লার এই লাল তেঁতুল শুধু একটি গাছ নয়, এটি স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস এবং বাংলার বিরল উদ্ভিদবৈচিত্র্যের এক জীবন্ত নিদর্শন।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)