SOCIAL MEDIA

Newsletter

PARTNER SITES
Select Language Select State

পেশায় ইঞ্জিনিয়র, সাঁতারে দেশের হয়ে জোড়া পদক চুঁচুড়ার প্রসেনজিতের

Asian Masters Swimming Championship: কাঁধে চোট পান। সুস্থ হয়ে উঠতে সাঁতার কাটার পরামর্শও দেন চিকিৎসক। সেই পরামর্শই যেন বদলে দেয় তাঁর জীবন

Reported By Sekender Abu Zafar Written By Sekender Abu Zafar
Published: Oct 11, 2026, 08:29 PM IST | Updated: Oct 11, 2026, 08:38 PM IST
Image Credit: সাঁতারু প্রসেনজিৎ দাস
Join

বিধান সরকার: পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। নেশা সাঁতার। অফিসের ব্যস্ততা,রাত জেগে কাজ আর গুরুতর কাঁধের চোট কোনও কিছুই দমাতে পারেনি তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। ৩৬ বছর বয়সে এশিয়ান মাস্টার্স সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের হয়ে জোড়া ব্রোঞ্জ জিতে নজির গড়লেন হুগলির চুঁচুড়ার প্রসেনজিৎ দাস। এবার তাঁর লক্ষ্য ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ।

প্রসেনজিৎ বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে থাকেন। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হলেও সাঁতার তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অক্টোবর মাসে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এশিয়ান মাস্টার্স সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৩৫-৩৯ বছর বয়সীদের বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন তিনি। শুধু তাই নয়,২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপেও যোগ্যতা অর্জন করেছেন এই বাঙালি সাঁতারু।

এই সাফল্যের পথ মোটেই সহজ ছিল না। অসুস্থতা, চোট, পেশাগত ব্যস্ততা কোন কিছুই বাধা হতে পারেনি।সব বাধা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন প্রসেনজিৎ।

ছোটো থেকে সাঁতার শেখা শুরু করেন প্রসেনজিৎ। ছোটবেলায় মা প্রতিদিন তাঁকে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেতেন। কিন্তু ১৬ বছর বয়সে পড়াশোনার চাপে সাঁতার থেকে সরে আসতে হয়। পরবর্তী কয়েক বছর জিমে ওয়েট ট্রেনিং করেই শরীরচর্চা চালিয়ে যান তিনি।

কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রায় তিন মাস ঘরবন্দি থাকতে হয় তাঁকে। জিম খুলতেই ফের শরীরচর্চা শুরু করেন। কিন্তু তখনই ঘটে বিপত্তি। কাঁধে চোট পান তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রাম নিতে হয়।  চোট থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে সাঁতার কাটার পরামর্শও দেন চিকিৎসক।

সেই পরামর্শই যেন বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ। ২০২২ সালে ফের জলে নামেন প্রসেনজিৎ। যে চোট তাঁর ক্রীড়াজীবনে ইতি টেনে দিতে পারত, সেই চোটই তাঁকে আবার সাঁতারের জগতে ফিরিয়ে আনে।

আরও পড়ুন-'জয় ছাড়া কোনও রেজাল্ট নেই'! আত্মবিশ্বাসী প্যানোস জিততে মরিয়া, দ্বিতীয়ায় ISL বোধন মোহনবাগানের

জাতীয় স্তরে চারটি পদক পাওয়ার পর ২০২৩ সাল থেকে মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন প্রসেনজিৎ। প্রথম দিকে ফ্লাইং সুইমিং ও লাইফ সেভিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। ২০২৫ সাল থেকে সুইমিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার অধীনে জাতীয় মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শুরু করেন। চলতি বছর হরিয়ানায় অনুষ্ঠিত ২২তম ন্যাশনাল মাস্টার্স সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে পশ্চিমবঙ্গের হয়ে চারটি পদক জেতেন তিনি।

প্রসেনজিৎ বলেন,৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে ৩৬.১৮ সেকেন্ড সময় করে সোনা জেতেন। ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে ১ মিনিট ২৬.১৯ সেকেন্ড সময় করে পান রুপো। পাশাপাশি ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে ২৮.৯১ সেকেন্ড সময় করে ব্রোঞ্জ এবং ৪x৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল রিলেতেও ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি।

বেঙ্গালুরুতে কর্মসূত্রে থাকলেও নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সোনা জেতার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে বিশেষ গর্বের।
অসুস্থতা কাটিয়ে এশিয়ান মঞ্চে জোড়া ব্রোঞ্জ

জাতীয় প্রতিযোগিতার পরেই শুরু হয় নতুন লড়াই। ৪ থেকে ১০ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত দ্বিতীয় এশিয়ান মাস্টার্স সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার আগে ভাইরাল ফিভার সংক্রমণে আক্রান্ত হন। প্রায় এক সপ্তাহ অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়। তার উপর অফিসের কাজের চাপ এবং রাত জেগে কাজ করার কারণে ঠিকমতো ঘুমও হচ্ছিল না।

সব মিলিয়ে টানা তিন সপ্তাহ একদিনও জলে নামতে পারেননি তিনি। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কেমন ফল হবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে দুটি ইভেন্টেই ব্রোঞ্জ পদক জিতে নেন প্রসেনজিৎ।

৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে ২৮.৫৯ সেকেন্ড সময় করে তৃতীয় হন তিনি। জাতীয় প্রতিযোগিতার তুলনায় এই ইভেন্টে নিজের সময়ও উন্নত করেন। শ্রীলঙ্কার এক প্রতিযোগীর সঙ্গে একই সময়ে শেষ করায় দু'জনকেই যুগ্মভাবে তৃতীয় ঘোষণা করা হয়।

অন্যদিকে, ৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে ৩৬.৮১ সেকেন্ড সময় করে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। এই ইভেন্টের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে আরও স্মরণীয়। প্রতিযোগিতার আগে স্টার্টিং ব্লকে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আচমকাই ছিঁড়ে যায় তাঁর সুইমিং ক্যাপ। কিন্তু তাতে ঘাবড়ে না গিয়ে মনোযোগ ধরে রাখেন। এরপর জলে ঝাঁপিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত সেই ইভেন্টেও আসে ব্রোঞ্জ পদক।

জাপান, চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ইরান-সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে একই মঞ্চে লড়াই করে এই সাফল্য তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।

চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও ফিটনেসে জোর পেশাদার সাঁতারুদের মতো সারাক্ষণ অনুশীলনের সুযোগ নেই প্রসেনজিতের। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পূর্ণ সময়ের চাকরি সামলে প্রশিক্ষণের জন্য সময় বের করাই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। মূলত নিজের উদ্যোগেই অনুশীলন করেন তিনি। তবে সাঁতারের কৌশল উন্নত করতে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেন।

কোভিডের সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, সুস্থ শরীর কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রসেনজিৎ বলেন, টাকা রোজগার করলেও শরীর সুস্থ না থাকলে সেই উপার্জনের আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব নয়। তাই কাজের চাপ যতই থাকুক, নিয়মিত কোনও না কোনও ধরনের শরীরচর্চা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
শুধু সুইমিং পুলেই সীমাবদ্ধ নয় তাঁর ক্রীড়াচর্চা। ওপেন ওয়াটার সুইমিংয়েও অংশ নেন প্রসেনজিৎ। সম্প্রতি বার্গম্যান বেঙ্গালুরু ২ কিলোমিটার ওপেন ওয়াটার সুইমিং ইভেন্টে রুপো জিতেছেন। পাশাপাশি দৌড়ের বিভিন্ন ইভেন্টেও অংশ নেন। গত বছর কয়েকটি ট্রায়াথলন প্রতিযোগিতাতেও অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।

সাফল্যের পিছনে মায়ের অবদান নিজের সাফল্যের জন্য মাকে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেন প্রসেনজিৎ। ছোটবেলায় যিনি প্রতিদিন তাঁকে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেতেন, তাঁর অবদান আজও ভোলেননি তিনি। পাশাপাশি সব সময় পাশে থাকার জন্য স্ত্রীকেও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

সাঁতারের কৌশল উন্নত করতে সাহায্য করেছেন বর্ধমানের সন্দীপ চক্রবর্তী, মুম্বইয়ের ক্ষিতিজ প্রসাদ এবং বেঙ্গালুরুর প্রাক্তন অলিম্পিয়ান নিশা মিলেট চ্যাটার্জি।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে নামার স্বপ্ন এশিয়ান মঞ্চে সাফল্যের পর এবার প্রসেনজিতের লক্ষ্য ২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াটিক্স মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নশিপ। ইতিমধ্যেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছেন তিনি। তবে বিশ্বমঞ্চে নামার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কারণ, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যাবতীয় খরচ বহন করতে হবে নিজের উপার্জন থেকেই। এখনও পর্যন্ত কোনও স্পনসর ছাড়াই নিজের ক্রীড়াজীবনের খরচ সামলেছেন তিনি।
প্রসেনজিতের আশা, কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে বিশ্বমঞ্চে আবারও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারে।
৩৬ বছর বয়সে পূর্ণ সময়ের চাকরি সামলে আন্তর্জাতিক স্তরে পদক জয় প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে নতুন করে শুরু করার কোনও নির্দিষ্ট বয়স হয় না।

(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)

Add Zee News as a Preferred Source

About the Author

প্রিন্ট মিডিয়া দিয়ে শুরু। বর্তমানে ডিজিটালে। সবেমিলিয়ে প্রায় দু'দশক। রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ক্রাইম, ক্রীড়া, ইতিহাস, ফিচার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ লেখালেখিতে বিচরণ।

ZEENEWS TRENDING STORIES