জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: উত্তর ভারত মহাসাগরে যেখানে বছরে গড়ে ৪ থেকে ৫টি প্রধান ক্রান্তীয় ঘূর্ণাবর্ত বা ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, সেখানে দেশের পশ্চিমভাগে আরব সাগরে শেষ ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল ২০২৫-এর অক্টোবরে, তেজ। ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আরব সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে প্রায় চার গুণ বেশি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। যার জ্বলন্ত উদাহরণ, অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের সাত দিনের মধ্যে ধেয়ে আসছে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। আপাতদৃষ্টিতে একই মহাসাগরীয় অঞ্চলের অংশ হওয়া সত্ত্বেও কেন দুই সাগরের ভিন্ন আচরণ? এর নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু ভৌগোলিক, তাপীয় এবং আবহাওয়াজনিত গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা
ঘূর্ণিঝড় তৈরি ও তা ধরে রাখার জন্য প্রধান অনুঘটক হল সমুদ্রের উষ্ণ জল। বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠদেশের জলের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে ২৬.৫ ডিগ্রি থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। এই ক্রমাগত অতিরিক্ত তাপ ও বাষ্পীভবন ঘূর্ণিঝড়কে দ্রুত শক্তিশালী হতে সাহায্য করে।
মিষ্টি জলের প্রভাব ও নোনা জলের স্তরবিন্যাস
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও গোদাবরীর মতো বিশাল নদীগুলো বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল বঙ্গোপসাগরে এনে ফেলে। এর ফলে সমুদ্রের ওপরের স্তরে কম লবণাক্ত জলের একটি হালকা আস্তরণ বা ‘ব্যারিয়ার লেয়ার’ তৈরি হয়। এই স্তরটি নিচের ঠান্ডা জলের সঙ্গে ওপরের গরম জলের মিশ্রণ রোধ করে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠে তাপ আটকে থাকে এবং ঘূর্ণাবর্ত আরও শক্তি সঞ্চয় করে।
ইউ-আকৃতির ভৌগোলিক গঠন
উত্তর বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক আকৃতি অনেকটাই ফানেল বা চোঙের মতো। এই সংকীর্ণ ও অবতল গঠনের কারণে ঝড় যখন ভারতের পূর্ব উপকূল, বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের দিকে এগিয়ে যায়, তখন জলোচ্ছ্বাস ও ঝোড়ো হাওয়ার তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
‘আপওয়েলিং’ বা শীতল জলের অনুপস্থিতি
আরব সাগরে শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ‘আপওয়েলিং’ ঘটে, অর্থাৎ গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা জল ওপরের দিকে উঠে এসে সমুদ্রপৃষ্ঠকে শীতল করে এবং ঝড়ের শক্তি কমিয়ে দেয়। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে এই ধরনের কোনও প্রক্রিয়া বড় আকারে ঘটে না, ফলে ঝড় তার শক্তি হারায় না।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় টাইফুনের অবশিষ্টাংশ
প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম ঘূর্ণিঝড়-প্রবণ এলাকা। সেখানকার শক্তিশালী টাইফুনগুলো দুর্বল হয়ে যখন মালয় উপদ্বীপ ও ইন্দোচীন অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়, তখন এখানকার উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় সেগুলো পুনরায় নতুন করে নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।
বাতাস ও আর্দ্রতার প্রভাব
আরব সাগরের ওপর দিয়ে আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার শুষ্ক বাতাস প্রবাহিত হয়, যা মেঘ গঠনে বাধা দেয় এবং ঝড়কে দুর্বল করে। পক্ষান্তরে, বঙ্গোপসাগর চারিদিক থেকে অত্যন্ত আর্দ্র ও জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস দ্বারা আবৃত থাকে, যা ঘূর্ণিঝড় গড়ে ওঠার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)