সাঁড়াশি চাপে জ্ঞানেশ কুমার: ভোটের নিয়মে কি বড় ধাক্কা? সুপ্রিম কোর্টে টানটান সওয়াল-জবাব, বাংলার SIR এ বড় মোড়
Supreme Court on SIR Gyanesh kumar: জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি ও সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তৃণমূল সাংসদ দোলা সেনের মামলায় নোটিশ সুপ্রিম কোর্টের। হলফনামার জবাবে সময় পেলেন মামলাকারীরা। পরবর্তী শুনানি ১৭ নভেম্বর।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যখনই প্রশ্ন ওঠে, তখনই সবার নজর যায় শীর্ষ আদালতের দিকে। জনগণের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়ে ঠিক এমনই স্পর্শকাতর আইনি টানাপোড়েনের কেন্দ্রে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India - ECI) এবং বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner - CEC) জ্ঞানেশ কুমার। সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে যৌথ ক্ষমতা লঙ্ঘন করে ‘একতরফা সিদ্ধান্ত’ (Unilateral Decision-Making) নেওয়া এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (Special Intensive Revision - SIR) প্রক্রিয়ায় বেনিয়মের অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি এবং আইন মেনে না চলার অভিযোগে তৃণমূল সাংসদ দোলা সেনের দায়ের করা মামলায় কমিশনকে নোটিশ ইস্যু করল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।
নির্বাচন কমিশনে এই সংক্রান্ত যাবতীয় ফাইল রেকর্ড সংরক্ষণ করার আবেদন জানান আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী এবং অভিষেক মনু সিংভি।
এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে পালটা কড়া হলফনামা পেশ করে যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী, সাংবিধানিক স্বাধীনতা এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতার বিষয়ে কী বলছে শীর্ষ আদালত এবং নির্বাচন কমিশন
বিরোধের কেন্দ্রে কী? ঠিক কী অভিযোগ উঠেছে পিটিশনে?
মামলাকারীদের মূল অভিযোগ-- জাতীয় নির্বাচন কমিশন একটি বহু-সদস্যের সংস্থা (Multi-Member Body), যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের (ECs) মতামত নিয়ে সর্বসম্মত বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম। কিন্তু মামলাকারীদের দাবি:
একতরফা কর্তৃত্বের প্রয়োগ: সিইসি জ্ঞানেশ কুমার কমিশনের যৌথ সম্মতি ছাড়াই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একার দায়িত্বে রূপায়ণ করেছেন।
SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক: বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা যাচাই ও নাম বাদ দেওয়ার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী অর্থাৎ ‘SIR’ (Special Intensive Revision)-এ ন্যায্য ভোটারদের নাম বিনা নোটিশে বাদ গিয়েছে।
এসআইটি তদন্তের দাবি: সিদ্ধান্তের বৈধতা খতিয়ে দেখতে পিটিশনকারীরা একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের আর্জি জানান।
সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের যুক্তি: 'এই অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিডিয়া-রিপোর্টের ভিত্তিতে...'
মামলার জবাবে সুপ্রিম কোর্টে বিস্তারিত হলফনামা (Counter Affidavit) দাখিল করেছে নির্বাচন কমিশন। শীর্ষ আদালতে কমিশনের পেশ করা মূল যুক্তিগুলো কী কী?
সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ সর্বসম্মত: নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, SIR সম্পর্কিত যে তিনটি সরকারি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল, তা কমিশনের সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেই গৃহীত হয়েছিল। একতরফা কাজ করার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমের খবরের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এবং পুরোপুরি অসত্য।
কমিশনের ফাইল নিয়েও নির্দিষ্ট বিধি: হলফনামায় কমিশন ব্যাখ্যা করেছে যে, যেকোনও সরকারি ফাইল প্রথমে একজন কমিশনার, তারপর অন্য কমিশনার এবং পরিশেষে সিইসি-র কাছে অনুমোদনের জন্য পৌঁছয়। জরুরি পরিস্থিতিতে ডিজিটাল অনুমোদন নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা নথিবদ্ধ করা হয়।
সিইসি-র কাজের উপর স্থগিতাদেশের আবেদন ভিত্তিহীন: পিটিশনকারীদের ‘কুয়ো ওয়ারেন্টো’ (Quo Warranto Writ) সংক্রান্ত আর্জিকে সরাসরি খারিজ করে কমিশন জানায়, ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সংক্রান্ত আইনের ১৮ নম্বর ধারা (Section 18 of the CEC Act, 2023) অনুযায়ী কমিশনের কাজে সরাসরি বাধা দেওয়ার কোনও আইনি এক্তিয়ার নেই।
সংবিধানের সুরক্ষা: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের যেভাবে সংবিধানের ৩২৪ ধারা ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ (Removal Process) করা যায়, সিইসি-র ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। কোনও আইনি ভিত্তি ছাড়া পিটিশনের মাধ্যমে সিইসি-র কাজ স্থগিত করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।
ভোটারদের কি হয়রানির শিকার হতে হবে?
SIR প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের আতঙ্ক দূর করতে সুপ্রিম কোর্টে অবস্থান স্পষ্ট করেছে কমিশন:
ফর্ম ৬ অপরিবর্তিত: ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলার জন্য ‘ফর্ম ৬’ (Form 6)-এ কোনও রদবদল করা হয়নি।
শুনানির ভয় নেই: যে সমস্ত ভোটারের ম্যাপিং এখনও হয়নি, তাঁদের সরাসরি শুনানিতে (Physical Hearing) হাজির হতে হবে না। বুথ লেভেল অফিসাররা (BLOs) প্রয়োজনে ভোটারদের বাড়ি গিয়ে নথি সংগ্রহ করবেন। একান্ত জটিল ক্ষেত্রে অনলাইন শুনানি হতে পারে।
কেন এই মামলার দিকে তাকিয়ে গোটা দেশ?
এই মামলা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার (Transparency and Institutional Autonomy) এক বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে ২০২৪-এর সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী বিধি ও ভোটার তালিকার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীরা যখন ধারাবাহিক প্রশ্ন তুলছে, তখন সর্বোচ্চ আদালতের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা মজবুত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
আরও পড়ুন: 'সর্বসম্মতিতেই SIR-র সিদ্ধান্ত', সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশনের
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)