বাবা আবার ঠিক ফিরে আসবে! ৪ বছর ধরে ফ্রিজে বন্দি নিথর দেহ, দুর্গন্ধ ছড়াতেই সামনে এল অবিশ্বাস্য সত্যি
তদন্তে নেমে হতবাক হয়ে যান তদন্তকারীরা। পুলিস জানতে পারে, ২০২২ সালের জুন মাসে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ওই ব্যক্তি। কিন্তু বাবার মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তাঁর মেয়ে। বাবাকে নিজের কাছে রাখতে তিনি শেষকৃত্য ও দাহ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। এর বদলে দেহ সংরক্ষণের জন্য একটি বিদেশি সংস্থার সাহায্য নেন তিনি।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাবা আর নেই, কিন্তু বিশ্বাস যে তিনি আবার ফিরে আসবেন। বাবার পুনরুজ্জীবনের আশায় চার বছর ধরে দেহ সংরক্ষণ। দেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতেই বন্ধ ডে-কেয়ার সেন্টারের পর্দাফাঁস। ঘটনাটি মুম্বইয়ের।
মেয়ের অন্ধবিশ্বাস:
মুম্বইয়ের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার সত্যি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তাঁর মেয়ে। তাই বাবার শেষকৃত্য ও দাহ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে মেয়ে। পরিবর্তে দেহ সংরক্ষণের চরম পদক্ষেপ নেন তিনি। মেয়ের বিশ্বাস ছিল যে, ভবিষ্যতের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরে মৃত বাবা একদিন আবার বেঁচে ফিরবেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে কীভাবে?
বাইরে ঝুলছিল বোর্ড:'ডে-কেয়ার সেন্টার, খুব শীঘ্রই চালু হচ্ছে'। তার ঠিক নীচেই মূল গেটে ঝুলছে তালা। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। দিনের পর দিন সেই গন্ধ টেকা দায় ওঠে স্থানীয় বাসিন্দাদের। অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে সন্দেহ প্রকাশ করে কুরার থানায় খবর দেন তাঁরা। পুলিস এসে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতেই উদ্ধার হয় বৃদ্ধের নিথর দেহ। স্থানীয় ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে এমন দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান তদন্তকারীরা।
আসল ঘটনাটি ঠিক কী?
প্রাথমিক তদন্তে নেমে পুলিসের সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিস জানিয়েছে, বাবার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিল তাঁর পরিবার। মুম্বইয়ের বাসিন্দা তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের কেউই এই মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। বিশেষ করে বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণেই মেয়ে শেষকৃত্য না করে ২০২২ সাল থেকে দেহটি সেখানে লুকিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে দেহটি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে তাঁরা জানিয়েছিলেন, আমেরিকার একটি বিশেষজ্ঞ 'ক্রায়োনিক্স' সেন্টারে মৃতদেহটি পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
কী এই 'ক্রায়োনিক্স' পদ্ধতি?
ক্রায়োনিক্স হল মৃত্যুর ঠিক পরই মৃত ব্যক্তির শরীরকে প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমিয়ে রেখে দেওয়া হয়। যাতে ভবিষ্যতে কোনও উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সেই মানুষকে আবার বাঁচিয়ে তোলা যায়। তবে এই 'ক্রায়োনিক্স' পদ্ধতি এখনও সম্পূর্ণ পরীক্ষামূলক স্তরেই রয়েছে।
অন্যদিকে, গোটা ঘটনায় পরিবার কিংবা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ- কেউই আগে পুলিস বা প্রশাসনকে কিছু জানায়নি। দুর্গন্ধের জেরে পর্দাফাঁস হতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে নিজের পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে আইনজীবী নিয়োগ করেছেন ওই মহিলা। কুরার থানার পুলিস ঘটনাটির পারিবারিক ও আইনি—উভয় দিক খতিয়ে দেখে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালাচ্ছে। এভাবে পুলিসকে না জানিয়ে বছরের পর বছর মৃতদেহ আটকে রাখা আইনত বৈধ কি না এবং কত দিন রাখা যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিচ্ছে পুলিস। বৃদ্ধের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার বিষয়েও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ভারতে ক্রায়োনিক্স নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা বা অনুমোদনের আইন নেই। তবে বিষয়টি ভারতীয় সংবিধান, ফৌজদারি আইন ও স্বাস্থ্যনীতির আওতায় পড়ে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংবিধান অনুযায়ী বেঁচে থাকার ও মর্যাদার অধিকার মৃত্যুর পরেও বহাল থাকে। ফলে মৃতদেহের মর্যাদা বজায় রেখে সামাজিক রীতি মেনে সৎকারের নির্দেশই স্বাভাবিক নিয়ম। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, কেউ স্বেচ্ছায় ক্রায়োনিক্স বেছে নিলে তা এই অধিকারের আওতায় আসতে পারে, তবে ভারতের আইনে এর কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ডিপ-ফ্রিজ বা বরফে সংরক্ষণ করা আর বৈজ্ঞানিক ক্রায়োনিক্স কখনওই এক নয়। এর আগে ২০১৪ সালে আধ্যাত্মিক গুরু আশুতোষ মহারাজকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করলেও ভক্তদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ‘সমাধি’র দাবির কারণে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট দেহটি ফ্রিজারে রাখার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু পুলিসকে না জানিয়ে গোপনে কোনও স্থানে মৃতদেহ আটকে রাখা বড় ধরনের অপরাধমূলক সন্দেহের জন্ম দেয়। বিশেষত মৃত্যু লুকিয়ে রাখা কিংবা মৃতের পেনশন তোলা বা আর্থিক জালিয়াতির উদ্দেশ্য থাকলে তা কঠোর শাস্তির আওতায় আসে।
এ ছাড়া ভারতে মৃত্যুর আইনি সংজ্ঞা ১৯৯৪ সালের মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণার পরপরই ক্রায়োনিক্স শুরু করতে হয়, যার ফলে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নথিভুক্তি, ময়নাতদন্ত এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে একাধিক আইনি জটিলতা তৈরি হয়। ফরেনসিক বা ডিএনএ প্রমাণের স্বার্থে তদন্তকারীরা শূন্যের নিচের তাপমাত্রায় টিস্যু বা জৈব নমুনা সংরক্ষণ করলেও, পুনরুজ্জীবনের আশায় আস্ত মানবদেহ এভাবে গোপনে জমিয়ে রাখা ভারতের আইনি ও চিকিৎসা ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)