EXPLAINER: 'এক ঘণ্টার মধ্যেই'...! এবারই ইরানে আমেরিকা পরমাণু প্রলয়! ভারতেও তার ভয়াল প্রভাব, হাড়হিম ভবিষ্য়দ্বাণী বিশেষজ্ঞদের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে তিনি ইরানের পিকাক্য় মাউন্টেনে আঘাত হানতে পারেন। তাঁর অনুগত এবং ফক্স নিউজের প্রাক্তন উপস্থাপক টাকার কার্লসনের দাবি সেখানে একটি পারমাণবিক হামলার প্রস্তুতি চলছে। এই পারমাণবিক হামলার ফলে ভারতেও কি ভয়াল প্রভাব পড়বে?
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আমেরিকা আবারও পরমাণু যুদ্ধের রণদুন্দুভি বাজিয়ে দিয়েছে! ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুগত এবং ফক্স নিউজের প্রাক্তন উপস্থাপক টাকার কার্লসনের দাবি, আমেরিকা এবার ইরানের পিকাক্স পাহাড়ে পারমাণবিক হামলার কথা ভাবছে। যা এক সম্ভাব্য ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা। ট্রাম্প নিজেও কোনও না কোনও ধরনের হামলার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেননি। ট্রাম্প যদি সত্যিই এমন পদক্ষেপ নেন, তবে এর পরিণতি কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্দিষ্ট কিছু আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বা ফলআউট পাকিস্তান এমনকী উত্তর-পশ্চিম ভারতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে! তবে এখানে একটি বেশ বড় ‘যদি’ রয়েছে। ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় ইসফাহান প্রদেশে অবস্থিত পিকাক্স মাউন্টেনে ভারত থেকে প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার দূরে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নিতান জানিয়েছেন, তেজস্ক্রিয়তা কতটা ছড়িয়ে পড়বে তা নির্ভর করবে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর—যেমন পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরক ক্ষমতা, বিস্ফোরণের ধরন এবং তৎকালীন আবহাওয়া পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এমনকি যদি সব শর্ত পূরণও হয়, তবুও দূরত্বের কারণে তেজস্ক্রিয়তার তীব্রতা অনেকটাই কমে যাবে।
ট্রাম্প কি ইরানের উপর পারমাণবিক হামলা চালাবেন?
ট্রাম্প কি আদৌ এমন ঝুঁকি নেবেন? সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার হুমকি দিয়েছেন যে, যুদ্ধ অবসানের চুক্তিতে ইরান সম্মত না হলে তিনি পিকাক্স পাহাড়ে বোমা হামলা চালাবেন। তবে এখনও পর্যন্ত তিনি কোনও হামলা চালাননি। এখন জোর গুঞ্জন, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আমেরিকা ও ইসরায়েল হয়তো আরও বড় শক্তি নিয়ে ইরানের উপর হামলা চালাবে। পিকাক্স পাহাড়ে হামলার বিষয়টি খোদ ট্রাম্পই উত্থাপন করেছিলেন। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের হয়তো পিকাক্সের দিকে নজর দিতে হবে। আমরা চাইলে যে কোনোও মুহূর্তে এমনকী এক ঘণ্টার মধ্যেই তা করতে পারি।' কার্লসন জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প হয়তো পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার খুব কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছেন। কার্লসনের মতে পারমাণবিক হামলাই একমাত্র সামরিক বিকল্প। কারণ প্রচলিত মার্কিন অস্ত্র দিয়ে ওই স্থানের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলিকে ঘিরে থাকা ৩০০ ফুট পুরু কঠিন গ্রানাইট পাথর ভেদ করা সম্ভব নয়।' রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলেন, 'লক্ষ্যবস্তু হবে পিকঅ্যাক্স' যেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার দাবি অনুযায়ী ইরান সরকার পুনরায় তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে তিনি এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ দেননি। তার এই উদ্বেগজনক দাবির মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। কার্লসন বলেন আমেরিকার হামলায় পারস্য উপসাগর জুড়ে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াকে জড়িয়ে একটি পারমাণবিক সংঘাত শুরু হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, পিকাক্সে হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রায় প্রতিদিনই ট্রাম্পের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন। কার্লসনের সংযোজন, 'নেতানিয়াহুর চাপে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ইরানের উপর পারমাণবিক হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।' তবে ট্রাম্পের এই অনুগত ব্যক্তির উদ্বেগজনক দাবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উপহাসের শিকার হয়েছে। কার্লসন তার দাবির সমর্থনে কোনও মার্কিন কর্তার নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর সতর্কবার্তাগুলি মূলত বেনামী সূত্রের উপর ভিত্তি করেই দেওয়া। অবশ্য কয়েক সপ্তাহ আগে নিউজম্যাক্সকে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প কিছুটা ভিন্ন সুর শুনিয়েছিলেন। 'আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই'
আরও পড়ুন: ১২০ ঘণ্টায় ২৩ ভারতীয় নাবিকের বলি! অজ্ঞাত ভয়াল আকাশযানে তছনছ জাহাজ! সমুদ্রে কালো ধোঁয়া-আগুন
পারমাণবিক হামলার তেজস্ক্রিয়তা কি ভারতেও আসবে
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মারিও নফল জানিয়েছেন, পারমাণবিক হামলার ফলে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় অবশেষ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকী এর কিছু অংশ অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্বে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও পৌঁছাতে পারে। পিকাক্স পাহাড়ে আমেরিকার পারমাণবিক হামলার এক মডেল-ভিত্তিক প্রাক্কলন তুলে ধরেছেন। এই প্রাক্কলন অনুযায়ী, পঞ্জাব, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর এবং গুজরাট-সহ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় তেজস্ক্রিয় অবশেষের উপস্থিতি দেখা দিতে পারে, যদিও এর মাত্রা হবে বেশ কম। তবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে! যেমন বিস্ফোরণের সময় পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষের মতো কতটুকু উপাদান বায়ুমণ্ডলে মিশে যাচ্ছে এবং বাতাসের গতিপ্রকৃতি কেমন। তেজস্ক্রিয় কণা শত শত মাইল দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যদিও দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর ঘনত্ব ও বিকিরণের তীব্রতা কমতে থাকে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বড় আকারের তেজস্ক্রিয় কণাগুলি সাধারণত বিস্ফোরণস্থলের কাছাকাছিই থিতু হয়ে পড়ে, কিন্তু ছোট কণাগুলি দীর্ঘ সময় বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এবং অনেক দূর পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। উন্নিথান বলছেন, যদি আমেরিকা পারমাণবিক হামলা চালায় এবং বাতাস সেই তেজস্ক্রিয় মেঘকে পূর্ব দিকে নিয়ে যায়, তবে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মডেল অনুযায়ী পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ঝুঁকির মাত্রা বেশি। বাতাসের দিক ও গতির ওপর নির্ভর করে এই তেজস্ক্রিয় কণাগুলো ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আরও গভীরে পৌঁছে যেতে পারে। উন্নিথান আরও বলেন, 'যদি ইরানের উপর কোনও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে তেজস্ক্রিয়তার বড় অংশট বিস্ফোরণস্থলের আশেপাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাতাসের কারণে কিছু তেজস্ক্রিয় উপাদান পূর্ব দিকে পাকিস্তান ও ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সেখানে এর পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য বা ‘ট্রেস লেভেল’-এ (খুবই সামান্য মাত্রায়) নেমে আসবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বৃষ্টিপাত, যা তেজস্ক্রিয় কণা কোথায় জমা হবে তা নির্ধারণ করতে পারে। যেসব অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে স্থানীয়ভাবে তেজস্ক্রিয় দূষণের মাত্রা বেশি হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এস বি আস্থানা মন্তব্য করেছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যে কোনও সিদ্ধান্ত ইরানের জন্য তাৎক্ষণিক ভাবে এবং পরবর্তীতে আমেরিকার জন্যও বিপর্যয় হবে। এর বেশ কিছু প্রভাব পড়বে। তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ পাকিস্তান, কুয়েত, জর্ডান-সহ এর মিত্র দেশগুলির দিকে ছড়িয়ে পড়বে। এছাড় এটি রাশিয়ার সামনে কিয়েভে পারমাণবিক হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শেষ করার সুযোগও তৈরি করে দেবে...
ইরানের পিকাক্স মাউন্টেন
ট্রাম্প ও কার্লসনের ধারাবাহিক মন্তব্যে ইরানের পিকঅ্যাক্স পাহাড়কে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ধারণা, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ—যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়—এই সুরক্ষিত স্থাপনায় মজুদ করে রেখেছে। তবে এর বেশিরভাগই এখনও কেবল শোনা কথা বা অনুমান। এক বিশাল পাহাড়ের ৩২৮ ফুট গভীরে অবস্থিত এই স্থাপনাটি রহস্য ও জল্পনা-কল্পনায় ঘেরা। প্রকৃতপক্ষে এটি ইরানের অন্য দুই প্রধান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র—ফোরদো ও নাতাঞ্জের চেয়েও অনেক বেশি গভীরে অবস্থিত। গত বছর এই কেন্দ্রগুলিতে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। সেই হামলায় আমেরিকা বাঙ্কার-বাস্টার বোমা বা জিবিইউ-৫৭ ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সেগুলো সর্বোচ্চ ৬০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত ভেদ করতে সক্ষম। এই কারণেই পিকঅ্যাক্স পাহাড়কে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা চালানোই হয়তো একমাত্র উপায় হতে পারে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)