জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি এবং পর্দায় চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতার জন্য তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণে তাই শোকের আবহ চলচ্চিত্রমহলে। প্রিয় সহকর্মী ও অভিভাবকসুলভ মানুষটিকে স্মরণ করে আবেগঘন হয়ে পড়লেন শাহরুখ খানও। আর হবে নাই বা কেন? কেরিয়ারের বিভিন্ন সময়ে পাশে পেয়েছেন নানাকে। সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ বার্তায় তিনি তুলে ধরলেন নানা পাটেকরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা স্মৃতি।
নানার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথাই প্রথমে মনে পড়েছে শাহরুখের। সেই সময় ভীতি এবং জড়তা থেকে নিজের চুল নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন তিনি। কিন্তু নানা পাটেকর তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘হিরোর মতো চুল ঠিক করিস না... তুই একজন অভিনেতা!’ ছোট্ট সেই মন্তব্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল অভিনয় সম্পর্কে নানার গভীর দর্শন। তারকা হওয়ার চেয়ে অভিনেতা হয়ে ওঠাকেই তিনি যে বেশি গুরুত্ব দিতেন, সেই শিক্ষা শাহরুখ আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন।
আরও পড়ুন- ৭৫-এ থামল নানা পাটেকরের জীবন, গোয়ার বাড়িতে
শাহরুখের কথায়, নানা কখনও চাটুকারিতা করতেন না। কেউ কী শুনতে চাইছে, তা নয়; বরং একজন মানুষের যা শোনা দরকার, সেটিই সরাসরি বলে দিতেন তিনি। এই সোজাসাপ্টা, কখনও খিটখিটে অথচ ভীষণ সৎ মানুষটির মধ্যেই ছিল এক অসাধারণ মানবিকতা। আর সেই কঠিন ব্যক্তিত্বের আড়ালে ছিল অত্যন্ত সুন্দর একটি হাসি।
নানার ভালোবাসা প্রকাশের ধরনটিও ছিল একেবারেই আলাদা। শাহরুখের স্মৃতিতে, প্রথমে তিনি চিৎকার করতেন, কখনও একের পর এক গালাগালও দিতেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বোঝা যেত, আসলে সেই রাগের আড়ালে রয়েছে গভীর স্নেহ। কথা বলতে বলতেই কখন যে তিনি জড়িয়ে ধরেছেন, তা টের পাওয়া যেত না। শাহরুখ লিখেছেন, নানা তাঁকে ভালোবাসতেন, আর তিনিও নানা পাটেকরকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন।
শুধু সহকর্মী নন, নানা ছিলেন শাহরুখের কাছে অভিভাবক, শিক্ষক, সমালোচক এবং বন্ধু—সব একসঙ্গে। তাঁদের সম্পর্কের আরও একটি মজার দিক ছিল ক্যারম। শাহরুখের স্মৃতিতে, ক্যারম বোর্ডে নানা ছিলেন কার্যত অপরাজেয়। একের পর এক ম্যাচে আশপাশের সবাইকে হারিয়ে নিজের জয় দারুণ উপভোগ করতেন তিনি। সেই খেলাধুলোর স্মৃতিও আজ শোকের মুহূর্তে আরও বেশি করে মনে পড়ছে শাহরুখের।
নানাকে হারানোর পর শাহরুখের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—আরও কিছু কথা বলা হল না। আরও একটি তর্ক, আরও এক কাপ চা কিংবা ক্যারমের আরও একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ যদি পাওয়া যেত! প্রিয় মানুষকে হারানোর পর অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলিই যে কত বড় হয়ে ওঠে, শাহরুখের কথায় তারই প্রতিফলন।
নানা পাটেকরের চলে যাওয়াকে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবে দেখেননি শাহরুখ। তাঁর মতে, এই প্রয়াণ চলচ্চিত্রজগতের পাশাপাশি ভারতীয় এবং বিশ্বের অগণিত মানুষের হৃদয়ে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। তবে শোকের মধ্যেও নানার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাকে আঁকড়ে রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে নানার সেই অমূল্য পরামর্শ—‘হিরো হওয়ার চক্করে ভেতরের অভিনেতাটাকে হারিয়ে ফেলিস না’—শাহরুখের মনে চিরকাল থেকে যাবে। একজন শিল্পীর কাছে তারকার পরিচয়ের চেয়ে অভিনেতা সত্তার গুরুত্ব কতটা, এই একটি বাক্যেই যেন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শাহরুখ তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্যে নানার আত্মার শান্তি কামনা করেছেন এবং তাঁকে অসাধারণ অভিনেতা ও অপরাজিত ক্যারম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্মরণ করেছেন। শেষের দিকে তাঁর আবেগঘন স্বীকারোক্তি—‘বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেলেন আমার হিরো অ্যাক্টর!’—শুধু এক সহকর্মীকে হারানোর বেদনা নয়, বরং একজন প্রিয় শিক্ষক, বন্ধু এবং অভিভাবককে হারানোর গভীর শূন্যতার কথাই যেন বলে দেয়।
নানা পাটেকরের অভিনয় যেমন দর্শকের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে, তেমনই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সেই সরল, কঠিন অথচ গভীর জীবনবোধও থেকে যাবে তাঁর প্রিয়জনদের মনে। শাহরুখের স্মৃতিচারণে তাই মৃত্যুর শোকের পাশাপাশি উঠে এসেছে এক শিল্পীর প্রতি আরেক শিল্পীর গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)