অয়ন শর্মা: তাঁর হাত ধরেই সূচনা হয়েছিল SNCU-র। তিনি SNCU-র রূপকার। কিন্তু তাঁকেই ব্রাত্য করে রেখেছিল মমতার সরকার। একপ্রকার বাধ্য করেছিল রাজ্য ছাড়তেও। এইমস-এর উপদেষ্টা স্বনামধন্য সেই ড. অরুণ সিংকে ফেরাল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। বাংলার কৃতী চিকিৎসককে বাংলায় ফেরাল বিজেপি সরকার। রাজ্যের অন্যতম সুপার ফেসিলিটি হাসপাতাল এসএসকেএম-এর জন্য বিশাল অবদান ছিল ড. অরুণ সিংয়ের। তাঁর হাত ধরেই ২০০০ সালে এসএসকেএম-এ নিওন্যাটোলজি বিভাগের সূচনা। শিশুচিকিৎসায় বাংলা পথ দেখিয়েছিল সারা দেশকে! কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক ভাবাদর্শীর হওয়ার কারণেই রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পূর্বতন সরকারের 'কোপদৃষ্টিতে' পড়েছিলেন স্বনাম্যধন্য শিশু চিকিৎসক ড. অরুণ সিং। তাই কর্মভূমি হিসেবে বাংলা ছেড়ে তাঁকে বেছে নিতে হয়েছিল ভিন রাজ্যকে। অবশেষে ফের 'ঘরে ফিরতে' চলেছেন তিনি। তাঁকে ফেরাচ্ছে বঙ্গ বিজেপি সরকার। প্রবীণ নিওন্যাটোলজিস্ট অরুণ সিংকে দু বছরের জন্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।
কে ড. অরুণ সিং?
বর্তমানে যোধপুর এইমস-এ নিওন্যাটোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত প্রফেসর ড. অরুণ কুমার সিং। পাশাপাশি, ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনে শিশুস্বাস্থ্য এবং 'রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রম' (RBSK)-এর একজন জাতীয় উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাংলায় এসএসকেএম-এ ছিল তাঁর দীর্ঘ অবদান। IPGMER তথা এসএসকেএম হাসপাতালের নিওন্যাটোলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। তাঁর ভাবনাতেই ২০০০ সালে এসএসকেএম-এ গড়ে ওঠে নিওন্যাটোলজি বিভাগ। শিশুমৃত্যু ঠেকাতে পুরুলিয়ার দেবেন মাহাত হাসপাতালে সূচনা হয় SNCU-র। পরবর্তী দেশের প্রায় ১০০ জেলায় হাসপাতালে সেই SNCU গড়ে ওঠে। যা পুরুলিয়া মডেল নামে পরিচিত। ভারতের শত শত জেলায় অসুস্থ নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র- 'সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট' (SNCU)-এর রূপকার হিসেবে তিনি 'ধাত্রী লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড'পান।
মমতার সরকারের বঞ্চনা
নবজাতকের চিকিৎসায় যে মডেল ড. অরুণ সিং আবিষ্কার করেছিলেন, পরবর্তীতে সমগ্র দেশের জন্য তা একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়। ডাক্তারি চিকিৎসায় সদ্যোজাতের চিকিৎসায় নিওন্যাটোলজির যে বই রয়েছে, সেখানে স্থান করে নেয় ড. অরুণ সিংয়ের এই মডেল। কিন্তু স্বনামধন্য সেই চিকিৎসককেই দেশব্যাপী শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়ার অনুমতি দেয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। উলটে স্টেট কলেজ অফ মেডিসিন অ্যান্ড সাগর দত্ত হাসপাতালে (CMSDH) তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়। যেখানে কোনও শিশুরোগ বিভাগ-ই ছিল না। যার জেরে পদত্যাগ করেন ড. অরুণ সিং। ভিন্ন রাজনৈতিক ভাবধারার অনুগত হওয়াতেই তিনি ২০১১-তে রাজ্যে পালাবদলের পর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের রোষানলে পড়েন বলে অভিযোগ।
২০১১-তে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল সরকার। ২০১২-র ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক মমতা সরকারকে দফায় দফায় চিঠি পাঠিয়ে ড. সিংকে দু'বছরের জন্য তাঁর বর্তমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানায় বলে জানা যায়। সারা দেশব্যাপী যে জাতীয় প্রকল্পের জন্য ড. সিংয়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্য চাওয়া হয়েছিল, তা প্রায় ২৭ কোটি শিশুর কল্যাণে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু, শিশুমৃত্যু নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের গঠন করা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের এক সদস্যের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধের কারণে ড. অরুণ সিং তাঁর আগেই কোপের মুখে পড়েন বলে অভিযোগ। তাঁকে ছাড়েনি মমতার সরকার। উলটে তাঁকে কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে বদলি করা হয়।
ড. অরুণ সিংয়ের বায়োডেটা
দিল্লির এইমস থেকে পেডিয়াট্রিকসে এমডি করেন ড. অরুণ সিং। ২০০০ সালের শুরুর দিকে এসএসকেএম হাসপাতালে চালু করেন 'নিওন্যাটোলজি' বিভাগ। পুরুলিয়া জেলা— যা একসময় পশ্চিমবঙ্গে শিশুমৃত্যুর হারে শীর্ষ স্থানে ছিল— সেখানে 'সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট' (SNCU) তৈরির কৃতিত্বও তাঁর। পরবর্তীতে পুরুলিয়ার এই সফল মডেলটি-ই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু, ড.অরুণ সিংকে জাতীয় স্তরে কাজ করতে বাধা দেয় মমতার সরকার। উলটে সাগর দত্তে বদলি করার সময় স্বাস্থ্য দফতর তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তদন্তের নির্দেশ দেয়। সূত্রের খবর, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের একটি চিঠিতে কেবল বলা হয়েছিল যে, তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের পছন্দের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির এক সদস্যের সঙ্গে "অসভ্য আচরণ" করেছেন।
কিন্তু স্বাস্থ্য ভবনের এক বর্ষীয়ান কর্মকর্তা সেই সময় স্পষ্ট জানিয়ে ছিলেন যে, তদন্ত চললেও ড. অরুণ সিংকে ডেপুটেশনে জাতীয় স্তরে কাজ করতে রাজ্যের বাইরে পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনও আইনি বাধা ছিল না। বহু চিকিৎসক ও সরকারি কর্মকর্তা সেইসময় স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, "মমতার সরকার নিছকই 'প্রতিশোধপরায়ণতা' থেকে এমনটা করছে।" প্রসঙ্গত, পূর্বতন তৃণমূল সরকার বা মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এক নয়, একাধিকবার উঠেছে। যে রোষালনের কোপে পড়েছিলেন বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসের প্রাক্তন ডিরেক্টর ও প্রখ্যাত স্নায়ুশল্য চিকিৎসক শ্যামাপদ ঘোড়ুই। তাঁকেও বরখাস্ত করা হয়েছিল।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)