জি ২৪ ঘন্টা ডিজিটাল ব্যুরো: শারদোৎসবের আনন্দ নিমেষে বদলে গেল বুকভাঙা কান্নায়। উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের (Chorebagan Sarbojanin Durgotsab) মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারালেন কাঁকুড়গাছির তরুণী শুভম সোনকার (Shubham Sonkar, বয়স ৩২)। শনিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাসি-মুখে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বাবা-মা এবং ছোট বোন শ্রেয়া। কিন্তু মণ্ডপের ভেতরে লাগামছাড়া জনস্রোত এবং চরম অব্যবস্থার মুখে পড়ে এক লহমায় তছনছ হয়ে গেল সোনকার পরিবার।
ভিড়ের প্রচণ্ড চাপে চোখের সামনে দিদিকে আছড়ে পড়তে দেখেও বাঁচাতে পারেননি বোন শ্রেয়া। নিজে কোনওমতে মৃত্যুর মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও দিদিকে আর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী বোনের কান্না
সেই অভিশপ্ত মুহূর্তের কথা মনে করে এখনও শিউরে উঠছেন বোন শ্রেয়া। তিনি জানান, মণ্ডপে ঢোকার পরেই চারদিক থেকে তীব্র ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পেছনের জনস্রোতের চাপে সামনের ব্যারিকেড ও সাধারণ দর্শনার্থীরা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ঠিক তখনই শুভম মাটিতে পড়ে যান।
শ্রেয়ার কথায়, 'চারদিকে শুধু মানুষের চিৎকার আর প্রাণ বাঁচানোর হুড়োহুড়ি। দিদি যখন পড়ে গেল, আমি হাত ধরে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এত মানুষের চাপ আর পায়ের ধাক্কা আসছিল যে আমি ধরে রাখতে পারলাম না। আমার হাত ফস্কে দিদি নিচে চলে গেল। চোখের সামনে দিদিকে পদপিষ্ট হতে দেখলাম, অথচ কিছুই করতে পারলাম না।'
ভিড় টানার নেশাই কি কাল হল?
এই মর্মান্তিক পরিণতির পর চোরবাগান সর্বজনীনের উদ্যোক্তাদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে সরাসরি তোপ দেগেছেন শ্রেয়া। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ-- মণ্ডপের ভেতরে যখন তিলধারণের জায়গা ছিল না, তখনও বাইরে থেকে নির্বিচারে মানুষকে ভেতরে ঢোকানো হচ্ছিল।
ভিড় নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বড় পুজোর তালিকায় নিজেদের নাম তুলে ধরার জন্য এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘রেকর্ড লোকসমাগম’ (Record Footfall) দেখানোর লক্ষ্যেই কি অতিরিক্ত দর্শনার্থীদের জোর করে ভেতরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল? শ্রেয়ার অভিযোগ এই মৌলিক প্রশ্নকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন
শারদোৎসবে মণ্ডপে মানুষের ঢল নামা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুজো উদ্যোক্তা ও পুলিস প্রশাসনের যে যৌথ এসওপি (Standard Operating Procedure - SOP) থাকার কথা, তা চোরবাগানে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল বলে দাবি স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের।
প্রবেশ ও প্রস্থানে গাফিলতি: মণ্ডপে ঢোকা এবং বেরোনোর জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকায় একমুখী যান ও জনচলাচল ভেঙে পড়ে এক বিপজ্জনক বটলনেক (Bottleneck) তৈরি হয়।
আপৎকালীন ব্যবস্থার অভাব: ভেতরে মানুষ পড়ে যাওয়ার পরও দ্রুত তাঁদের বের করার মতো কোনো সক্রিয় ভলান্টিয়ার বা প্যারামেডিক্যাল সাপোর্ট পাওয়া যায়নি।
আনন্দ যখন প্রাণঘাতী
শুভমের পরিবারের কাছে এই উৎসব আর কোনোদিন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসবে না। চোখের সামনে দিদির নিথর দেহ আর সেই ভিড়ের বীভৎস স্মৃতি আজীবন তাড়া করে বেড়াবে বোন শ্রেয়াকে। চোরবাগানের এই অকালমৃত্যু গোটা রাজ্যের পুজো সংস্কৃতিকে এক গভীর আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়ে দিল—পুজোর আসল সাফল্য কি শুধুই মণ্ডপে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় বাড়ানো, নাকি প্রতিটি দর্শনার্থীর প্রাণ সুরক্ষিত রাখা?