জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দেখতে গেলে কলকাতার চেয়েও হাওড়ার ঐতিহ্য বেশি। তা অনেক পুরনো শহরই শুধু নয়, শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি-- সবেতেই হাওড়ার এক অনন্যতা প্রায় প্রতিটি যুগেই লক্ষ্য করা গিয়েছে। এই ছাপ রয়েছে এর দুর্গাপুজোতেও। কলকাতার বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য ও আড়ম্বরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো জোর হাওড়ার আছে। হাওড়ায় বহু নামকরা ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পুজোর অস্তিত্ব আজও আছে। যেমন, আন্দুলের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো। এই তালিকায় উজ্জ্বল অস্তিত্ব নিয়ে আছে আন্দুলের কুন্ডু বাড়ি, পাতিহালের ঘোষবাড়ি ও রায়বাড়ি এবং শিবপুরের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোও। গঙ্গার দুই তীরের দুই শহর দুর্গাপুজোর সময় যেন পরস্পরের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
আন্দুলের ভট্টাচার্য বাড়ি
১৬৫১ সালে চুঁচুড়ার নোয়াপাড়া থেকে রঘুনাথ তর্কবাগীশ হাওড়ার আন্দুলের দত্তচৌধুরীদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সেখানে আসেন। তৎকালীন জমিদার চৌধুরীরা তাঁকে সরস্বতী নদীর পশ্চিম তীরে বসবাসের জন্য জমি দান করেন। কালক্রমে রঘুনাথের বংশধররা হয়ে উঠলেন দত্তচৌধুরী পরিবারের কুলগুরু। ১৬৫৭ সালে রঘুনাথ তাঁর বাসগৃহের ঠাকুরদালানে আটচালায় দুর্গাপুজো শুরু করলেন।
আন্দুলের কুন্ডু বাড়ি
এই বাড়ি বছরে দুবার দুর্গাপুজোর আয়োজন করে-- বসন্তকালে এবং শরৎকালে। বসন্তকালে বাসন্তী পুজো আর শরৎকালে অকালবোধন। তবে এখানে কিন্তু মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো হয় না, হয় হরগৌরীর পুজো। এখানে নেই অসুর! নেই মোষ এবং সিংহও! ষাঁড়ের পিঠে আছেন শিব আর তাঁর পাশে মা দুর্গা। সঙ্গে গণেশ, কার্তিক, লক্ষী ও সরস্বতী। বৈষ্ণব পরিবার হওয়ায় বলি নিষেধ। এ বাড়ির আরেকটি বৈশিষ্ট্য দুর্গাপুজো চলার সময় গরুড়ের পুজো করা। সেসময় গরুড় একটি রূপোর সিংহাসনে পাশেই অধিষ্ঠান করেন। অষ্টমীতে ধুনো পোড়ানো হয়। দশমীতে সিঁদুর খেলার রীতি নেই।
পাতিহালের ঘোষবাড়ি
দুশো বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে পাতিহালের ঘোষবাড়ির পুজো। জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পুজো হয়। নবমীর দিন হোম-সহ কুমারীপুজো হয়।
পাতিহালের রায় বাড়ি
পাতিহালের রায়বাড়ির পুজোও বেশ বিখ্যাত। এদের দুর্গাপুজো শুরু হয় ৩০০ বছর আগে বর্ধমান রাজাদের হাতে। একসময় কামান দেগে সন্ধিপুজো শুরু হত। এখন কামান দাগার সেই শব্দ শোনা না গেলেও বাকি সব প্রথাই অটুট।
ডোমজুড়ের চন্দ্রবাড়ি
১৬৯৭ সালে ডোমজুড়ের খাটোরা গ্রামের চন্দ্রবাড়ির পুজো শুরু হয়। ৩২৩ বছরের এই পুজো নিয়মনিষ্ঠা মেনে একইভাবে চলে আসছে। ডাকের সাজে সাবেক চালচিত্রের একচালা প্রতিমা। এবাড়িতে লক্ষ্মী আর সরস্বতী পদ্মের উপর না দাঁড়িয়ে যথাক্রমে পেঁচা আর হাঁসের উপর দাঁড়িয়ে।
শিবপুরের ভট্টাচার্যবাড়ি
আজ থেকে ২০০-২৫০ বছর আগে এক সন্ন্যাসী হঠাৎ করে এই বাড়িতে এসে কিছুদিনের জন্য থাকতে চান। বেশ কিছুদিন থাকার পরে হঠাৎ করে তিনি স্থির করেন ভট্টাচার্য বাড়িতে দুর্গাপুজো করবেন। সেইমতো তিনি জন্মাষ্টমীতে মায়ের কাঠামো তৈরি করেন এবং মহালয়াতে মায়ের চক্ষুদান করেন। সেই রীতি মেনে আজও ভট্টাচার্য বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। এবাড়িতে দুর্গাদালানের পাশে শেতলার মন্দির আছে। ষষ্ঠীর দিন শেতলা তলায় আগে পুজো হয়, তারপর মায়ের বোধন হয়। এদের পুজোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য-- কলাবউ কার্তিকের পাশে থাকে।
আজও জন্মাষ্টমীর দিনই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। একই কুমোর পরিবার বংশানুক্রমে প্রতিমা তৈরির কাজ করে আসছেন। কৃষ্ণানবমী কল্পে বোধনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় চন্ডীপাঠ, হয় দুর্গার দশ হাজার নামজপ, হয় শ্রীকৃষ্ণের পাঁচশো নামজপও। পুজোর তিনদিন ও সন্ধিপুজোয় হয় পাঁঠাবলি। অষ্টমীর দিন কুমারী পুজো ও নবমীতে হয় বিশেষ যজ্ঞও।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)