পুরভোটের আগেই মিলবে বঞ্চিতদের ভোটাধিকার? এসআইআর জটে বাদ পড়াদের বড় স্বস্তি সুপ্রিম কোর্টে
SIR in Bengal: শুক্রবার মামলার বিশেষ উল্লেখের সময় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সাফ জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে নাম বাদ দেওয়ার আপিল শুনানি কিছুদিনের জন্য স্থগিত রেখে, যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তাঁদের নাম ফের অন্তর্ভুক্তির আবেদনগুলি আগে শোনা হবে। শুধু তা-ই নয়, আসন্ন নির্বাচনগুলির দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই যাতে এই সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সেই সম্ভাবনাও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে আদালত।
রাজীব চক্রবর্তী: রাজ্যের পুরভোটের আগেই বাংলায় ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর (Special Intensive Revision বা SIR) ঘিরে চলা দীর্ঘ আইনি জটিলতায় বড় ইঙ্গিত শীর্ষ আদালতের। ভোটার তালিকা থেকে ঢালাও নাম কেটে দেওয়ার চেয়ে বাদ পড়া যোগ্য নাগরিকদের নাম ফের ঢোকানোর (Inclusion of names) আবেদনকে প্রাধান্য দিতে হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। প্রয়োজনে নাম বাতিলের আবেদনের শুনানি পিছিয়ে দিয়েও নাম তোলার আর্জি আগে নিষ্পত্তি করতে হবে বলে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে। আগামী পুরভোটের মুখে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কী বললেন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ?
শীর্ষ আদালতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে বাংলার এসআইআর মামলাটির দ্রুত শুনানির জন্য ‘মেনশনিং’ (Mentioning) করা হয়। সেই সময়েই বেঞ্চের তরফে ইঙ্গিত মেলে, নির্বাচন কমিশনের নাম কাটার প্রক্রিয়ার চেয়ে কোনো নাগরিক যাতে অন্যায্যভাবে ভোটাধিকার (Franchise rights) থেকে বঞ্চিত না হন, আদালত সেই বিষয়টিকেই আগে নিশ্চিত করতে চাইছে।
প্রধান বিচারপতি এজলাসে জানান, যদি প্রয়োজন পড়ে তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনের শুনানি সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেওয়া হবে। পরিবর্তে যাঁরা নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আর্জি জানিয়েছেন, তাঁদের মামলাগুলোকে আগে অগ্রাধিকার (Priority) দেওয়া হবে এবং আসন্ন নির্বাচনের আগেই যাতে সেই আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি (Expedited disposal) করা যায়, শীর্ষ আদালত সেই রাস্তা খতিয়ে দেখছে।
ভূষণের সওয়ালে পুরভোটের আর্জি
এ দিন মামলাকারীদের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং গোপাল শঙ্করনারায়ণন দ্রুত শুনানির দাবি তোলেন। ট্রাইব্যুনালের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ যাওয়ার পর যাঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম ফের যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রাথমিক স্তরে কমিশনের তরফে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা অসঙ্গতি বা গলদ ছিল, এই পরিসংখ্যানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এর প্রেক্ষিতেই আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ আরও জানান-- যেহেতু হাজার হাজার আবেদনকারীর মামলা এখনও ট্রাইব্যুনাল বা আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারাধীন (Pending adjudication) রয়েছে এবং পূর্ববর্তী নিষ্পত্তির ট্রেন্ড অনুযায়ী তাঁদের সিংহভাগেরই নাম তালিকায় ফেরার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, তাই আসন্ন পুরসভা নির্বাচনে (Municipal Elections) তাঁদের সাময়িকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হোক। এই সওয়ালের প্রেক্ষিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, বিষয়টি শীর্ষ আদালত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দেখবে।
রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে কমিশনের ভূমিকা
বাংলায় এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকেই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলে আসছিল যে, বহু যোগ্য ভোটারের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের ক্ষেত্রে ‘ফর্ম ৬’ (Form-6)-এ অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি ওঠে শীর্ষ আদালতে। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি ছিল, তালিকায় থাকা ভুয়ো ও অনুপ্রবেশকারী ভোটারদের চিহ্নিত করতেই এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া। তবে ট্রাইব্যুনালে ৯৩ শতাংশ ভোটারের নাম পুনর্বহাল হওয়ার তথ্য সামনে আসায় নির্বাচন কমিশনের (ECI) প্রক্রিয়াকরণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে ফের জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
আইনি নজর এখন ১৬ অক্টোবরে
রাজ্যে গত কয়েক মাস ধরেই এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং ভোটার যাচাইকরণ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে। বিরোধী ও নাগরিক অধিকার রক্ষা মঞ্চের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনিক গাফিলতি ও তড়িঘড়ি যাচাইয়ের নামে রাজ্যের বহু প্রান্তে বিশেষ অংশের নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণের অপচেষ্টা চলছে।
শীর্ষ আদালতের এ দিনের ইতিবাচক অবস্থানের পর ওয়াকিবহাল মহলের মতে, পুরভোটের আগে যাঁদের নাম এখনও বিশ বাঁও জলে আটকে রয়েছে, তাঁদের ভোটাধিকার রক্ষায় এই পর্যবেক্ষণ কার্যত রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
পুরভোটের আগে যাঁদের নাম আটকে রয়েছে, তাঁরা আদৌ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন কি না, কিংবা নির্বাচন কমিশনকে নাম তোলার আর্জি মেটাতে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে কি না-- তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী শুনানিতে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আগামী ১৬ অক্টোবর মামলাটির বিস্তারিত শুনানি গ্রহণ করা হবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)