বিশ্বজিৎ মিত্র: সময়ের স্রোতে ভেসে গিয়েছে ৩৩০টি বছর। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতবদল হয়েছে পুজোর দায়িত্ব। কিন্তু রানাঘাটের পুরোহিত পাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'সদু-বাউনির' পুজোর জৌলুস বা আবেগে এতটুকুও ভাটা পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা যেন আরও পরিণত, আরও সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। এবার ৩৩১ বছরে পা দিল এই ঐতিহাসিক পুজো, যা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, রানাঘাটের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।
কীভাবে শুরু পুজো?
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, বাল্যবিধবা সদুদেবী তাঁর শ্বশুরবাড়ি কালনা থেকে এই পুজো নিয়ে এসেছিলেন নিজের জন্মভিটে সেকালের ব্রহ্মডাঙায়, যা আজকের রানাঘাটের পুরোহিতপাড়া। সেযুগে ব্রাহ্মণ ঘরের মহিলাদের 'বাউনি' বলে সম্বোধন করার রেওয়াজ ছিল। সেই থেকেই এই পুজোর নাম হয়ে ওঠে 'সদু-বাউনির পুজো'। এক নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং ভক্তির নিদর্শন হিসেবে শুরু হওয়া এই পুজো আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কালের নিয়মে সেই পরিবারের আজ আর কেউ বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি এবং পুজোর ঐতিহ্যকে পরম যত্নে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন এলাকার সাধারণ মানুষ।
পারিবারিক থেকে সর্বজনীন
একসময় এই পুজো সম্পূর্ণ পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ১৯৭১ সালে প্রথম তা সর্বজনীন রূপ পায়। আজ আর এটি শুধু একটি পরিবারের পুজো নয়, বরং গোটা পুরোহিতপাড়ার মানুষের প্রাণের উৎসব। পাড়ার প্রবীণ থেকে নবীন, নারী থেকে পুরুষ-- সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পুজোর আয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পুজোর কটা দিন গোটা পাড়া যেন এক বৃহৎ পরিবারে পরিণত হয়, যেখানে সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
বদলায়নি ভোগের ঐতিহ্য
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর বাহ্যিক আড়ম্বরে অনেক পরিবর্তন এলেও, মায়ের কাছে ভোগ নিবেদনের রীতি আজও শতাব্দীপ্রাচীন পরম্পরা মেনেই চলে। ষষ্ঠীর দিনে মায়ের ভোগে থাকে কলাইয়ের ডাল, আর দশমীর দিন নিবেদন করা হয় পান্তা ভাত, কচুর শাক এবং চালতার টক। এছাড়াও আখ, কুমড়ো এবং কলা বলির প্রাচীন প্রথা আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। দেবীর ভোগ থেকে শুরু করে পুজোর প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরনো স্মৃতি। নতুন প্রজন্মও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে এই সমস্ত রীতিনীতি মেনে চলে।
আধুনিকতার ছোঁয়া, তবুও অটুট বিশ্বাস
একসময়ের একচালা মাটির সাজের প্রতিমা আজ সেজে ওঠে দৃষ্টিনন্দন ডাকের সাজে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিসর্জনের পদ্ধতিতেও এসেছে বদল। কিন্তু যা বদলায়নি, তা হল মানুষের আবেগ আর মায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আধুনিকতার চাকচিক্যের মাঝেও এখানে আজও পুজোর মূল সুরটুকু অবিকৃত। পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন আর নতুন দিনের উন্মাদনা-- এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে সদু-বাউনির পুজোর স্বকীয়তা। ৩৩১ বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সদু-বাউনির পুজো প্রমাণ করেছে, ভক্তি এবং ঐতিহ্য সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা পড়ে না। এবং এটি শুধু রানাঘাটেরই নয়, গোটা বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা আগামী প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)