ঐতিহ্যবাহী পাঁজা বাড়ির ৩০৩ বছরের দুর্গোৎসব, পুরনো ঠাকুরদালানে সাবেকি প্রতিমা, শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়
Durga Pujo: পাঁজা বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে সামাজিক ভোজের ঐতিহ্যও। কাচ কিংবা আধুনিক বাসনপত্রের ব্যবহার বাড়লেও ঐতিহ্যের স্মারক সেই পুরনো বাসনগুলি এখনও পাঁজা বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে
পার্থ চৌধুরী: পূর্ব বর্ধমানের সাটিনন্দী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাঁজা বাড়ির ৩০৩ বছরের দুর্গোৎসব—পুরনো ঠাকুরদালানে সাবেকি প্রতিমা, পরিবারের মিলন এবং শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয়। তিন শতাব্দীর ঐতিহ্যে আজও অমলিন পাঁজা বাড়ির দুর্গোৎসব। সাটিনন্দীর ৩০৩ বছরের বনেদি পুজোয় ইতিহাস, আভিজাত্য আর পারিবারিক মিলনের অপূর্ব মেলবন্ধন। বর্ধমানের রাজাদের আমলেরও আগে ঐতিহ্যের দাবি—পুরনো নাটমন্দিরের স্থাপত্যে আজও জেগে আছে অতীতের স্মৃতি।
পুজো আসে, পুজো যায়। সময় বদলায়, বদলে যায় উৎসবের রীতিও। কিন্তু বাংলার কিছু বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব এমন কিছু ঐতিহ্যকে বুকে ধরে রাখে, যা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি গ্রামের স্মৃতি এবং বাংলার সাবেকিয়ানার জীবন্ত দলিল। পূর্ব বর্ধমানের সাটিনন্দী গ্রামের পাঁজা বাড়ির দুর্গাপুজো ঠিক তেমনই এক ঐতিহ্যের নাম। এ বছর সেই পুজো ৩০৩ বছরে পদার্পণ করছে।
স্থানীয় পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, বর্ধমানের রাজাদের আমলেরও আগে থেকে এই পুজোর সূচনা। অর্থাৎ তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেবী দুর্গার আরাধনা চলে আসছে এই পাঁজা পরিবারে। সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলেছে, কিন্তু পাঁজা বাড়ির দুর্গোৎসব আজও ধরে রেখেছে তার পুরনো আভিজাত্য, পারিবারিক বন্ধন এবং বাংলার চিরচেনা সাবেকি রীতি।
পাঁজা পরিবারের ইতিহাসও এই দুর্গোৎসবের মতোই বিস্তৃত। ব্যবসা, চিকিৎসা, আইন, প্রশাসন, ক্রীড়া—সমাজের একাধিক ক্ষেত্রে এই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে বনোয়ারীলাল পাঁজা, রাধেশ্যাম পাঁজা, গোপাল পাঁজা, নরেন্দ্রনাথ পাঁজা এবং প্রফুল্ল কুমার পাঁজা—এই নামগুলি একসময় বর্ধমানের ব্যবসায়িক মহলে যথেষ্ট পরিচিত ছিল।
শিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রেও পাঁজা পরিবারের অবদান উল্লেখযোগ্য। এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডঃ শিশির কুমার পাঁজা এবং ডঃ সুশীল কুমার পাঁজা। আইনজীবী হিসেবে ভৈরব পাঁজা ও সুবোধকুমার পাঁজা-র নামও একসময় যথেষ্ট পরিচিত ছিল। পরিবারেরই আর এক কৃতী সদস্য সৌরভ পাঁজা ভারতীয় জাতীয় টেনিস দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
পরিবারের কৃতী সদস্যদের মধ্যে যাদবেন্দ্রনাথ পাঁজা-র নামও আরোও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—তিনি ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন । ছিলেন পরিচিত কংগ্রেস নেতা,স্বাধীনতা সংগ্রামী।
বোরহাটের পুরনো বাড়ি থেকে সাটিনন্দীর ‘দেশের বাড়ি’
বর্ধমান শহরের নতুনগঞ্জের বোরহাট এলাকায় আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে পাঁজা পরিবারের প্রায় তিনশো বছরের পুরনো বাড়ি—যা শহরে ‘পাঁজা বাড়ি’ নামে পরিচিত। এটিকেই পরিবারের আদি বাড়ি হিসেবে মনে করা হয়।
অন্যদিকে, সাটিনন্দীর বাড়িকে পরিবারে বলা হয় ‘দেশের বাড়ি’। কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা আজ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকলেও দুর্গাপুজো তাঁদের আবার এক সুতোয় বেঁধে দেয়।
পুজোর কয়েকটি দিন যেন দূরত্বের সমস্ত দেওয়াল ভেঙে যায়। পরিবারের ছোট-বড়, প্রবীণ-নবীন—সবাই এসে মিলিত হন সাটিনন্দীর পাঁজা বাড়িতে। তাই এই দুর্গোৎসব একইসঙ্গে দেবীর আরাধনা এবং এক বৃহৎ পারিবারিক পুনর্মিলন।
তিনশো বছরের পুরনো নাটমন্দির—ইট-কাঠের স্থাপত্যে জমে থাকা ইতিহাস
পাঁজা বাড়ির দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ তার পুরনো নাটমন্দির বা ঠাকুরদালান। পুরনো স্থাপত্যের চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী পরিসর।
গেরুয়া-লালচে রঙের দেওয়াল, প্রশস্ত সিঁড়ি, সারি সারি স্তম্ভ, খোলা বারান্দা এবং অলংকরণে সমৃদ্ধ সামনের অংশ—পুরো স্থাপনাটির মধ্যে রয়েছে পুরনো বাংলার বনেদি বাড়ির স্থাপত্যরীতির স্পষ্ট ছাপ। প্রবেশপথের উপরিভাগের অলংকরণ, স্তম্ভের নকশা এবং প্রশস্ত উঠোনের বিন্যাস একে নিছক পুজোর স্থান না রেখে একটি ঐতিহাসিক পারিবারিক পরিসরে পরিণত করেছে।
নাটমন্দিরের চারপাশের পুরনো বাড়ির অংশ, বিস্তৃত উঠোন, গাছপালা এবং প্রাচীন পরিবেশ যেন বর্তমান সময়কে পিছনে ফেলে কয়েক দশক, এমনকি কয়েক শতক আগের বাংলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
পারিবারিকভাবে এই নাটমন্দিরের বয়স তিনশো বছরেরও বেশি বলে জানানো হয়।
সাবেকি প্রতিমা, ডাকের সাজের ঐতিহ্য আর মাটির গন্ধ
পাঁজা বাড়ির প্রতিমাতেও রয়েছে বনেদিয়ানার স্বাক্ষর। দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবারকে ঘিরে সাজসজ্জায় রয়েছে সাদা শোলার কাজের অপূর্ব কারুকার্য, রঙিন ফুলের মালা, পুষ্পসজ্জা এবং ঐতিহ্যবাহী অলংকরণের ব্যবহার।
আরও পড়ুন-বর্ধমান অরবিন্দ পল্লিতে এবার থিম 'বাহন বন্দে ভারত ভূস্বর্গে মা', বাজেপ্রতাপপুরে 'স্বপ্নলোক'
দেবীর মুখাবয়ব, সাদা শোলার মুকুট ও সাজ, সিংহ-মহিষাসুরের বিন্যাস—সব মিলিয়ে প্রতিমার মধ্যে ফুটে ওঠে একেবারে সাবেকি বাংলার দুর্গাপুজোর আবহ। আধুনিক থিমের জাঁকজমক এখানে মুখ্য নয়। বরং পুরনো রীতিকে ধরে রাখাই যেন পাঁজা বাড়ির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
পুজো মানেই শুধু অঞ্জলি নয়, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়াও
পাঁজা বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক ভোজের ঐতিহ্যও। বাড়ির ভিতরে দীর্ঘ সারিতে বসে পরিবারের সদস্য ও অতিথিরা একসঙ্গে আহার করছেন। রান্না, পরিবেশন এবং খাওয়াদাওয়ার মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বনেদি বাড়ির পুজোর সেই পুরনো সবাই মিলে খাওয়া’-র সংস্কৃতি।
পুরনো কাঁসার থালা, তামার বাসনপত্র পরিষ্কার করার কাজও পুজোর প্রস্তুতির অন্যতম অংশ। সময়ের সঙ্গে স্টিল, কাচ কিংবা আধুনিক বাসনপত্রের ব্যবহার বাড়লেও ঐতিহ্যের স্মারক সেই পুরনো বাসনগুলি এখনও পাঁজা বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
আজকের দুর্গাপুজোয় আলো, থিম, প্রযুক্তি এবং নতুনত্বের প্রতিযোগিতা তীব্র। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও সাটিনন্দীর পাঁজা বাড়ি —ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো নাটমন্দির, শতাব্দীপ্রাচীন পারিবারিক রীতি, সাবেকি প্রতিমা, শোলার কারুকাজ, কাঁসা-তামার বাসন, ঢাকের আওয়াজ, পারিবারিক ভোজ এবং দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে ফিরে আসা—সব মিলিয়ে পাঁজা বাড়ির দুর্গোৎসব আসলে একটি পরিবারের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
৩০৩ বছরের এই পুজো তাই শুধু দেবী আরাধনার কাহিনি নয়; এটি সময়কে ধরে রাখার এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)