দুই হাতের দেবী দুর্গা, সিংহাসনে উপবিষ্টা! নবদ্বীপের অভয়া মা-র পুজোর ইতিহাস জানেন?
Nabadwip Abhaya Maa: এক হাতে বরাভয়, অন্য হাতে বালক শিব! নবদ্বীপে ব্যতিক্রমী দ্বিভুজা দুর্গার আরাধনা! ২৫০ বছরেরও প্রাচীন ঐতিহ্য, অভয়া মা-র পুজো ঘিরে বিশেষ আকর্ষণ।
অনুপ দাস: নবদ্বীপের নেতাজি সুভাষ রোডের পাঁচমাথার দক্ষিণাঞ্চল মেতে ওঠে এক 'ব্যতিক্রমী' দ্বিভুজা দুর্গার আরাধনায়। প্রচলিত ধারার বাইরে এখানে দেবী পূজিতা হন মা ‘অভয়া’ রূপে। সেই থেকেই এলাকাটি ‘অভয়া মা তলা’ নামে পরিচিত। জানা যায়, আজ থেকে আনুমানিক ২৫৫-২৬০ বছর আগে মাটি খুঁড়তে গিয়ে উদ্ধার হয়েছিল একটি ছোট ধাতব মূর্তি। সম্ভবত নদীয়ায় এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত ধাতব মূর্তিগুলির মধ্যে এটিই ক্ষুদ্রতম। মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ৭ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ৩.৫ সেন্টিমিটার। দেবী দ্বিভুজা। তিনি সিংহাসনে উপবিষ্টা। তাঁর ডান পায়ের উপর বাঁ পা স্থাপিত। ডান হাতে রয়েছে বরাভয় মুদ্রা। বাঁ হাতে কোনও একটি বস্তুর ভগ্নাংশ ধরা রয়েছে। দেবীর পাদদেশে থাকা সরীসৃপজাতীয় প্রাণীটিকে বিশেষজ্ঞরা গোধিকা বলে অনুমান করেন। তৎকালীন পণ্ডিতসমাজ শারদীয়া দুর্গাপুজোর সময় ধাতব মূর্তিটির প্রায় অনুরূপ একটি মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে 'অভয়া 'দুর্গার ধ্যানে পুজোর বিধান দেন। সেই থেকে নবদ্বীপের অভয়া মা তলায় একটি সাধারণ দালান মন্দিরে পুরুষানুক্রমে দুর্গাপুজোর সময় দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। উদ্ধার হওয়া প্রাচীন ধাতব মূর্তিটির নিত্যপুজো হয় প্রয়াত পুরোহিত নৃসিংহপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রামসীতাপাড়ার বাড়িতে।
আরও পড়ুন, দুর্গাপুজোয় কুমারী রূপে আরাধনা, জলপাইগুড়ি রামকৃষ্ণ মিশনে উৎসবের আবহ
দুর্গাপুজোর সময় অভয়া মা তলার দালান মন্দিরে মৃন্ময়ী প্রতিমার পাশাপাশি পুজো করা হয় এই প্রাচীন ধাতব মূর্তিটিরও। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, নবদ্বীপের যে স্থান থেকে মূর্তিটি উদ্ধার হয়েছিল, সেখানেই গড়ে উঠেছে মা অভয়ার মন্দির। মন্দিরে নিত্যপুজো হয়। পরবর্তীতে মন্দিরে নিত্যপুজোর জন্য প্রাচীন ধাতব মূর্তিটির আদলে একটি পাথরের মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে মন্দিরটি নবদ্বীপ শহরের হেরিটেজ তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধন হয়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত তিনদিন দেবীকে খিচুড়ি, অন্ন, পুষ্পান্ন ভোগ দেওয়া হয়। দশমীতে থাকে চিড়ে, মুড়কি, দই। দশমীর দুপুরে মৃন্ময়ী প্রতিমাটি গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়।
নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক তথা গবেষক শান্তিরঞ্জন দেব বলেন, আনুমানিক ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে মূর্তিটি আবিষ্কৃত হয়। চৈতন্যদেবের সময়ে গঙ্গার প্রাচীন শাখা অলকানন্দা এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল। ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই নদীপথে নৌকা চলাচলের উল্লেখ মেলে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে। অলকানন্দার পরিত্যক্ত খাতের চিহ্ন আজও এই অঞ্চলে দেখা যায়। মৃন্ময়ী মূর্তিতে দেবী ষোড়শী, হেমাঙ্গী এবং সিংহাসনে উপবিষ্টা। তাঁর ডান হাতে রয়েছে বরাভয় মুদ্রা। বাঁ হাতে ধরে রয়েছেন এক নগ্ন বালকের হাত। মূর্তিতে দেবীর কোনও বাহন নেই। পণ্ডিতদের একাংশ ওই বালককে শিবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পুরাণ অনুসারে, অসুর দমনের পর দেবতাদের আশ্বস্ত করতে দুর্গা বা ভগবতী অভয়ারূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। মূর্তিতে দেবীর ডান হাতে বরাভয় মুদ্রা থাকায় তাঁর নাম ‘অভয়া’ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে দেবী ছিন্নমস্তার রূপ দেখে ভীত শিব বা ভৈরবকে আশ্বস্ত করতে দেবী অভয়ারূপ ধারণ করেছিলেন। সেই কারণে এইরূপ নামকরণ হতে পারে। সেই সূত্রে মূর্তির বাঁ হাতে ধরা বালকটিকে ভৈরবের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেই কারণেই দেবী বালকটির হাত ধরে তাঁকে অভয় দিচ্ছেন বলে মনে করা হয়।
আরও পড়ুন, ডিউটির আড়ালে কুৎসিত রূপ! মহিলা হোমগার্ডের শরীরে 'নোংরা হাত',
সেবাইত বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায় বলেন, এখানে সারা বছরই নিত্যপূজো হয়। কথিত আছে, ভগবতী যখন ধ্যান করছিলেন সেই সময় বালকরূপি শিব দেবীর ধ্যান ভঙ্গ করার চেষ্টা করছিলেন। বাচ্চাদের ধরতে গেলে ছুটে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। সেরকমই শিব যাতে পালিয়ে না যান সেজন্য দেবী তাঁকে বাম হাতে ধরে রেখেছেন। ডান হাতে তিনি অভয় দিচ্ছেন। সেজন্য তিনি ও অভয়া মা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)