নরবলির ইতিহাস থেকে অলৌকিক তোপধ্বনি! জঙ্গলের বুকে আজও জীবন্ত প্রাচীন এক পুজো
Durga Puja 2026: সিদ্ধিলাভের আশায় নরবলি দেওয়ার প্রথা ছিল বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। লোককথা অনুযায়ী, সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনের আরাধ্যদেবী ছিলেন শ্যামারূপা। মন্দির চত্বরে থাকা একটি প্রাচীন গাছও ভক্তদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
চিত্তরঞ্জন দাস: বাংলার প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল রাজা লক্ষ্মণ সেনের শ্যামরূপা মন্দিরে। অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে তোপধ্বনির পর বলি, আর সেই পুজোকে ঘিরেই গড় জঙ্গলের গভীরে শ্যামরূপা মন্দিরে উপচে পড়া ভিড় ভক্তদের। দুর্গাপুজোর চারদিন দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষের সমাগমে উৎসবের চেহারা নেয় মন্দির চত্বর। কাঁকসার গড় জঙ্গলে এই প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্যময় কাহিনি ও লোকবিশ্বাস।
কথিত আছে, একসময় ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছত না মাটিতে। বাঘ-ভালুক-সহ হিংস্র জীবজন্তুর আতঙ্কে সাধারণ মানুষ এই জঙ্গলে প্রবেশ করতে ভয় পেত। আর সেই জঙ্গলের বুকেই চলত কাপালিকদের তন্ত্রসাধনা। সিদ্ধিলাভের আশায় নরবলি দেওয়ার প্রথা ছিল বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। লোককথা অনুযায়ী, সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনের আরাধ্যদেবী ছিলেন শ্যামারূপা। এই মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে ভক্ত কবি জয়দেব গোস্বামীর কাহিনিও।
আরও পড়ুন: দুর্গাপুজোয় কুমারী রূপে আরাধনা, জলপাইগুড়ি রামকৃষ্ণ মিশনে উৎসবের আবহ
আরও কথিত আছে, একবার এক কাপালিক নরবলি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় সেখানে উপস্থিত হন জয়দেব। নরবলি বন্ধ করার জন্য তিনি কাপালিককে বোঝান। দেবীর কাছে প্রার্থনার পর কাপালিক শ্যামা মায়ের মধ্যে শ্যামরূপের দর্শন পায়। এরপরই নরবলি বন্ধ হয়ে ছাগলবলি শুরু হয় বলে জনশ্রুতি। মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ অষ্টমীর সন্ধিক্ষণ। ভক্তদের বিশ্বাস, সেই সময় গড় জঙ্গলের কোনও অজানা স্থান থেকে ভেসে আসে তোপধ্বনির মতো শব্দ। সেই শব্দের পরেই শুরু হয় বলির প্রথা।
মন্দির চত্বরে থাকা একটি প্রাচীন গাছও ভক্তদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মনস্কামনা পূরণের আশায় সেই গাছের ডালে ইটের টুকরো বেঁধে রাখেন অনেকে। বছরের পর বছর ধরে সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গাছের ডালে জমেছে অসংখ্য ইটের টুকরো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে গড় জঙ্গলের পরিবেশ। আগের মতো হিংস্র জীবজন্তুর আতঙ্ক না থাকলেও শ্যামরূপা মন্দিরের ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাস আজও অটুট। দুর্গাপুজোর চারদিন মন্দিরকে ঘিরে বসে মেলা। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের জন্য আয়োজন করা হয় নরনারায়ণ সেবারও। মন্দিরের সেবাইত শ্যামসুন্দর রায় জানান, একসময় জঙ্গলে হিংস্র জীবজন্তুর দেখা মিলত।
আরও পড়ুন: ১২৫ বছরে পা দিল বেলুড় মঠের দুর্গাপুজো! স্বামীজির শুরু করা আসনে এবার কুমারী রূপে কে?
তাঁর কথায়, সেন বংশের পর তাঁরাই প্রথম মন্দিরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মায়ের সান্নিধ্যে এসে বহু মানুষের উন্নতি হয়েছে বলে বিশ্বাস ভক্তদের। দুর্গাপুজোর সময় দশ হাজারেরও বেশি মানুষের সমাগম হয় মন্দিরে। ইতিহাস, তন্ত্রসাধনার জনশ্রুতি, তোপধ্বনির রহস্য আর অগণিত ভক্তের বিশ্বাস সব মিলিয়ে পশ্চিম বর্ধমান জেলার কাঁকসার গড় জঙ্গলের শ্যামরূপা মন্দির আজও দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ। প্রতি বছর পুজোর দিনগুলিতে এই প্রাচীন মন্দিরে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)