সৌরভ চৌধুরী: পিতৃপক্ষেই বোধন, পটেশ্বরী রূপেই সাবিত্রী মন্দিরে পূজিত হন দুর্গা। দেবী পক্ষের সূচনার অপেক্ষায় যখন প্রহর গুণছে বাংলা। ঠিক তখনই উল্টো পথে হেঁটে পিতৃপক্ষেই পুজোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। নতুন রঙের প্রলেপ পড়েছে চণ্ডীমণ্ডপে। পটেশ্বরী দুর্গার রূপটানও সর্ম্পূন্ন শিল্পীর নিপুন হাতে। শতাব্দী প্রাচীন এই পুজো ঘিরে রয়েছে একাধিক কাহিনী। মন্দিরের সদস্যদের কাছ থেকেই শোনা যায় কেন এই ব্যতিক্রমী সময়ে পটেশ্বরী রূপে দুর্গার পুজো হয়। ১০১৬ বঙ্গাব্দে মল্লদেব বংশের আদিপুরুষ রাজা সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান এই পুজোর সূচনা করেন।
সেই হিসেব অনুযায়ী, এবার এই পুজোর ৪১৯ তম বর্ষ। পটে পুজো হওয়ার কারণ নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে পুরোহিত জানান, ‘কুলদেবী সাবিত্রীর নিত্য পুজো হয় দুর্গামন্ত্রে। রাজ বংশের কুলদেবী থাকায় দুর্গাপুজো হয় পটে।’ লোক সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, মল্লদেব বংশের কুলদেবী সাবিত্রীর কোনও মূর্তি নেই। মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবীর একগুচ্ছ কেশরাশিকে পুজো করা হয়। সম্ভবত, সেই কারণেই দুর্গাপুজোটিও হয় পটে। কৃষ্ণপক্ষের জিতাষ্টমী তিথিতে শুরু হয় সবিত্রী মন্দিরের ঐতিহ্যের দুর্গাপুজো। রাজবাড়ি থেকে মঙ্গলঘট নিয়ে আসা হয় কুলদেবী সাবিত্রীর মন্দিরে। হয় দেবীর অধিবাস। দেবী দুর্গা এখানে পটেশ্বরী রূপে পূজিত হয়ে আসছেন। দেবীপক্ষের আগেই পিতৃপক্ষে দুর্গার বোধন হয়। চারশো বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই প্রথা। বর্তমানে সেই জৌলুস না থাকলেও আরাধনার নিষ্ঠায় আর নির্ঘন্টের কোনও পরিবর্তন হয়নি।
মহালয়ার সপ্তাহ খানেক আগে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে মঙ্গলঘট স্থাপন করে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস শুরু হয়ে যায় পিতৃপক্ষে। রাজ বংশের কুলদেবী সাবিত্রীর মন্দির। মন্দিরের ভিতরে পৃথক চণ্ডীমণ্ডপে দুর্গাপুজো হয় পটে। আগে প্রাচীন পটটি ছিল শালপাতার ঝালরের উপর আঁকা। কয়েক শতাব্দী আগে সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন চণ্ডীমণ্ডপের দেওয়ালে চিত্রিত পটে দেবীর পুজো হয়। সে কারণেই নাম পটেশ্বরী দুর্গা। পিতৃপক্ষে পুজো শুরু হলেও, সেটি শেষ হয় বিজয়া দশমীতেই। কেন দেবীপক্ষের আগেই পুজো শুরু হয় তা নিয়েও নানা জনশ্রুতি রয়েছে। কথিত আছে এক সময়ে ঝাড়গ্রামের স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাস্ত করে রাজ্যপাট দখল করেন রাজপুতানার সর্বেশ্বর। তাঁর রাজ্যাভিষেকের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথিতে ইন্দ্রাভিষেক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
জনশ্রুতি, সেই উৎসবের রেশ ধরেই আশ্বিন মাসের জিতাষ্টমী তিথিতে রাজ পরিবারের সমৃদ্ধি ও প্রজাদের মঙ্গলকামনায় জিমূতবাহন অর্থাৎ ইন্দ্রের পুজো হয়। এর পাশাপাশি, শক্তিলাভের কামনায় জিতাষ্টমীর পরের দিন কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে অস্ত্র পূজার মাধ্যমে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয়। জিতাষ্টমীর রাতে মঙ্গলঘট আসে চণ্ডীমণ্ডপে। পরের দিন, কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে রাজ পরিবারের একটি প্রাচীন খড়্গ এনে অস্ত্র পুজো করা হয়। কথিত আছে, ওই খড়্গ দিয়ে বর্গি হামলা ঠেকিয়েছিলেন সর্বেশ্বরের পুত্র রাজা বিক্রম মল্ল উগাল ষণ্ডদেব। সাবিত্রী মন্দির এর দুর্গাপুজোটি ঝাড়গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন পুজো বলে মনে করা হয়। তবে পুজোর অতীত ইতিহাস আজ আর কারোরই তেমন জানা নেই। তবে অতীতের সাক্ষী হয়ে প্রতি বছর পূজিতা হন পটেশ্বরী দুর্গা।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)