চোরবাগান থেকে শিক্ষা! উৎসবের নিরাপত্তায় বিশেষ সতর্ক রাজ্য, ২৩ জেলায় ২৩ মন্ত্রীকে দায়িত্ব
চোরবাগানের ঘটনার থেকেই শিক্ষা। সামনেই কালীপুজো, দীপাবলি, ছটপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজো। নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সতর্ক রাজ্য সরকার।
পিয়ালি মিত্র: বঙ্গে এখন উত্সবের ভরা মরসুম। তবে সদ্যসমাপ্ত দুর্গাপুজোয় ঘটে গিয়েছে এক বেনজির মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। চোরবাগানের ঘটনার থেকেই শিক্ষা নিয়ে কালীপুজো, দীপাবলি, ছটপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সতর্ক রাজ্য সরকার। মণ্ডপের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে শুরু করে ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট— একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি স্বরাষ্ট্র দফতরের। পুজো কমিটিগুলির জন্যও পৃথক নির্দেশিকা জারি করেছে কলকাতা পুলিস। মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও প্রস্থানের পৃথক পথ (এন্ট্রি-এক্সিট গেট), অগ্নি নিরাপত্তা-সহ একাধিক বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ২৩ জেলার জন্য ২৩ মন্ত্রীকে দায়িত্ব বণ্টন রাজ্য সরকারের। কালীপুজো, দীপাবলি, ছটপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো, রাসপুজো ও কার্তিক পুজোর প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাই। রাজ্য সরকারের নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিতে উৎসবের যাবতীয় আয়োজন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নজরদারি চালাবেন মন্ত্রী-ইন-চার্জ এবং প্রতিমন্ত্রীরা। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার উপর। উৎসবের প্রস্তুতি আরও জোরদার করতে এবং সংশ্লিষ্ট সমস্ত দফতর ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। উৎসব চলাকালীন কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা ও দুর্ঘটনা এড়াতে আগাম প্রস্তুতি এবং নজরদারির উপর জোর রাজ্য সরকারের। চোরবাগানের ঘটনায় অন্ধকার, উঁচু র্যাম্প ও স্ট্রাকচারের প্রসঙ্গে উঠে এসেছে বারবার। এক্সিট গেটের আট ফুটের রাস্তায় ছিল স্টল। মাইকিং থেকেও বিপত্তি তৈরি হয়েছিল। ফলে এবার মাইকিংও অত্যন্ত শান্ত ভাবে করার কথাই বলা হয়েছে
চোরবাগানের জেরে কী কী নির্দেশিকা জারি হয়েছে
* কালীপুজোর মণ্ডপ ও দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে বিশেষ সতর্ক কলকাতা পুলিসও। নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট—একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি।
* ইতিমধ্যেই সমস্ত থানার তরফে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিগুলিকে নির্দেশিকাগুলি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
* আগামীকাল শহরের সমস্ত থানার সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করবেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার।
কলকাতা পুলিস-সহ সব জেলায় পুজো মণ্ডপগুলির জন্য নির্দেশিকায় যে বিষয়গুলিতে বিশেষ জোর
১. পুলিশ মোতায়েন ও পুজো কমিটির সঙ্গে সমন্বয়
* ভিড়ের সম্ভাব্য পরিমাণ বিবেচনা করে পর্যাপ্ত পুলিস মোতায়েন করতে হবে। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে।
* পুজো কমিটি, স্থানীয় ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করতে হবে।
* সাদা পোশাকের পুলিস এবং মহিলা পুলিস মোতায়েন করতে হবে।
* পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, সুশৃঙ্খল লাইন এবং নির্দিষ্ট অপেক্ষার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।
* ভিড় বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছলে সাময়িক ভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। বিপরীতমুখী ভিড়ের চাপে কাউকে জোর করে এগিয়ে দেওয়া যাবে না।
২. অগ্নি নিরাপত্তা
* সমস্ত বড় মণ্ডপ ও অস্থায়ী কাঠামো দমকল ও জরুরি পরিষেবা দফতরের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ভাবে পরিদর্শন করাতে হবে।
* মণ্ডপ চত্বরে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জলের বালতি ও বালির বালতি রাখতে হবে।
* মণ্ডপের সাজসজ্জায় অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা যাবে না।
* বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ ও জেনারেটরের জন্য আলাদা জায়গা রাখতে হবে।
৩. প্রবেশ, প্রস্থান ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা
* প্রবেশ ও বেরনোর জন্য পৃথক গেটের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক।
* প্রতিটি বড় মণ্ডপে অন্তত দুটি জরুরি নির্গমন পথ রাখতে হবে এবং আলোর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে EXIT চিহ্ন লাগাতে হবে।
* জরুরি নির্গমন পথ কোনওভাবেই স্টল বা দোকান দিয়ে বন্ধ করা যাবে না।
* অবাধ যাতায়াতের জন্য প্রবেশ ও প্রস্থান পথ পর্যাপ্ত প্রশস্ত রাখতে হবে।
৪. পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা
* মণ্ডপের ভিতরে, যাতায়াতের রাস্তা এবং পার্কিং এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
* বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
* অন্ধকার জায়গাগুলি চিহ্নিত করে সেখানে পর্যাপ্ত আলো দিতে হবে।
৫. মণ্ডপের কাঠামোগত স্থায়িত্ব
* বড় মণ্ডপ, অস্থায়ী সেতু ও ওয়াচ টাওয়ারের কাঠামোগত স্থায়িত্ব পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শংসাপত্র নিতে হবে।
* জলাশয়ের কাছে অথবা দুর্বল মাটির উপর তৈরি মণ্ডপগুলির ক্ষেত্রে বিশেষ পরীক্ষা করতে হবে।
* অস্থায়ী বাঁশের কাঠামোর উপর অতিরিক্ত ভার চাপানো যাবে না।
* প্রতিটি প্রবেশপথে মণ্ডপের ধারণক্ষমতা (Capacity Board) প্রদর্শন করতে হবে।
৬. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ পুলিশি নজরদারি
* সরু গলি, রাস্তার মোড়, ক্রসিং, উঁচু প্ল্যাটফর্ম, সিঁড়ি, র্যাম্প ও অস্থায়ী সেতুর মতো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় বিশেষ পুলিশি নজরদারি রাখতে হবে।
* যেখানে রাস্তার বা মাটির উচ্চতার আকস্মিক পরিবর্তন রয়েছে, সেখানে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
৭. সিসিটিভি, ড্রোন ও পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে নজরদারি
* সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে মণ্ডপ ও সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি চালাতে হবে।
* প্রয়োজনে অনুমোদিত ড্রোন ব্যবহার করে ভিড়ের পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে হবে।
* প্রবেশ, প্রস্থান এবং ভিড় ছড়িয়ে পড়ার জায়গাগুলিতে পুলিসকে সরাসরি নজরদারি চালাতে হবে।
* পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হবে।
৮. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
* বড় পুজো মণ্ডপের আশপাশে অপ্রয়োজনীয় যানবাহন চলাচল ও পার্কিং বন্ধ রাখতে হবে।
* দমকলের ইঞ্জিন, অ্যাম্বুল্যান্স এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবার গাড়ি যাতায়াতের রাস্তা সবসময় খোলা রাখতে হবে।
৯. দিকনির্দেশ ও জরুরি ঘোষণা
* পুজো কমিটিগুলিকে দিকনির্দেশক বোর্ড, জরুরি বহির্গমন পথের সাইনবোর্ড এবং নিরাপদ জমায়েতের জায়গা চিহ্নিত করতে হবে।
* জরুরি যোগাযোগের নম্বর স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
* প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে ঘোষণা করতে হবে।
প্রতিটি বড় মণ্ডপে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক: প্রতিটি বড় পুজো মণ্ডপ এবং নির্দিষ্ট ঘাটে একজন করে ইনসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর রাখতে হবে। জরুরি যোগাযোগের নম্বর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার লিখিত পরিকল্পনা রাখতে হবে। আগুন, কাঠামোগত বিপর্যয়, পদপিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, শর্ট সার্কিট বা অন্য কোনও বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিস কন্ট্রোল রুম ও দমকল বিভাগকে জানাতে হবে। বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে মণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট নিরাপদ রাস্তা দিয়ে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে ও সুশৃঙ্খলভাবে দর্শনার্থীদের বের করতে হবে। উল্টো দিক থেকে চলাচল, ধাক্কাধাক্কি, আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি আটকাতে হবে পুলিশকে। মাইকে স্পষ্ট, শান্ত ও নির্দিষ্ট নির্দেশ দিতে হবে, যাতে দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক না ছড়ায়। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি বা তীব্র যানজট তৈরি হলে অবিলম্বে নতুন করে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ভিড়ের চাপে থাকা এলাকায় আরও মানুষের চাপ ঢুকতে দেওয়া যাবে না। প্রশিক্ষিত আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে বেরিয়ে আসার রাস্তা খুলতে হবে। পুলিস, দমকল ও মেডিক্যাল টিমের মধ্যে সমন্বয় রেখে উদ্ধারকাজ, আহতদের সরানো, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি পরিষেবার গাড়ি চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট রাস্তা সব সময় ফাঁকা রাখতে হবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)