অর্ণবাংশু নিয়োগী: দুর্গাপুজোয় (Durga Puja) শহর থেকে মফস্সল-- রাস্তার মোড়ে কিংবা মণ্ডপের প্রবেশদ্বারে বামপন্থীদের লাল শালু ঘেরা বইয়ের স্টল বাঙালির বহু দশকের চেনা ছবি। কিন্তু এবার উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ ও নৈহাটিতে সেই ঐতিহ্যবাহী বুকস্টল (Book Stall) বসানো ঘিরেই ধুন্ধুমার রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাত। অনুমতি মেলেনি পুলিসের, উপরন্তু স্টল তৈরির জায়গায় অন্য সংগঠনের দখলদারির অভিযোগে শেষমেশ তা পৌঁছয় কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court)। আর সেই মামলার শুনানিতেই রাজ্য প্রশাসনের কাছে জানতে চাইল বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য (Justice Saugata Bhattacharyya)।
মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় রাজ্যের উদ্দেশে বলেন, 'সিপিআইএম অস্থায়ী বুকস্টল করতে চায়, পুলিস তাতে বাধা দিচ্ছে। ওঁনারা বই বিক্রি করতে চান, খাবার জিনিস তো নয়। আপনাদের কী বক্তব্য?' একই সঙ্গে বুধবারের মধ্যে রাজ্য সরকারকে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানানোর কড়া নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
ঠিক কী অভিযোগ সিপিআইএমের?
সিপিআইএমের (CPIM) অভিযোগ, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে নির্দিষ্ট জায়গায় পুজোয় তারা বুকস্টল দিয়ে আসছে, এবার নৈহাটি ও বনগাঁ-- উভয় জায়গাতেই তাদের স্থানীয় পুলিস-প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। দলের বক্তব্য, স্থানীয় পার্টি অফিসের সামনে যেখানে প্রতি বছর তাদের স্টল বসে, সেখানে এবার মামলা চলাকালীনই একটি অস্থায়ী কাঠামো গড়ে তুলেছে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ (Hindu Jagran Manch)।
সিপিআইএমের আইনজীবীর দাবি, পুজো উপলক্ষে স্টল বাঁধার জন্য বাঁশ-ত্রিপল নিয়ে গেলে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যরা সরাসরি পথ আটকায় এবং বাধা দেয়। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, গোটা ঘটনার সময় স্থানীয় পুলিস নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। এই পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মীদের মৌলিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ তুলে অবিলম্বে বুকস্টল করার অনুমতির দাবিতে জরুরি ভিত্তিতে আদালতের দ্বারস্থ হয় তারা।
আদালতে বিচারপতির তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
সিপিআইএমের আইনজীবী শামিম আহমেদ জানান, 'যেখানে প্রতিবার স্টল হত, সেখানে অন্য সংগঠন স্টল করছে। ফলে আমাদের কর্মীরা ওই জায়গার কাছাকাছি কোনও উপযুক্ত স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে স্টল বসাতে চান।'
শুনানি চলাকালীন সরকারি কৌঁসুলি বেঞ্চ বদলের প্রসঙ্গ টানলে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য জানিয়ে দেন, মামলাটি অন্য বেঞ্চে পাঠিয়ে দিলে উৎসবের আগে পদ্ধতিগত জটিলতায় পড়ে যাবেন মামলাকারীরা। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার মতো বিষয়ে বিলম্ব না করে এই এজলাসই শুনানি করবে।
এরপরেই বিচারপতির তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ-- 'ওঁরা তো কোনও খাদ্যসামগ্রী বা বিশৃঙ্খলা তৈরির জিনিস বিক্রি করছেন না, বই বিক্রি করছেন। তবে পুলিস কেন বাধা দিচ্ছে?'
রাজনৈতিক বিতর্ক
পুজোর মুখে বামেদের এই বুকস্টলকে কেন্দ্র করে সংঘাতের জল অনেক দূর গড়িয়েছে। দিনকয়েক আগেই রাজনৈতিক মহলে পুজোয় বুকস্টল ও 'শারদোৎসব' শব্দ ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে ওঠে। তার মধ্যেই হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সঙ্গে বাম কর্মীদের হাতাহাতি ও পুলিসের অসহযোগিতার অভিযোগ সামগ্রিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।
বুধবার রাজ্য সরকার আদালতে তাদের কী হলফনামা দেয় এবং পুলিস প্রশাসনের তরফে কী যুক্তি তুলে ধরা হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এবার উত্তর ২৪ পরগনা বামেদের লাল মলাটের বইয়ের পসরা আদৌ বসবে কি না।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)