শারদোৎসবে 'দুর্গা' নাম্নী কোনও দেবীর পুজো হয় না? দুর্গাপুজো আদতে আদি মাতা পৃথিবীরই অর্চনা?
Durga Puja 2026: নিরীহ একটি 'বোধহয়' যোগ করে শশিভূষণ দাশগুপ্ত নবপত্রিকা নিয়ে যে জরুরি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটা নিঃসংশয়ে মেনে নেওয়া ছাড়া সাধারণের কোনও উপায় থাকে না। তাঁর মতো তন্নিষ্ঠ গবেষকের 'বোধহয়' শব্দটিরও ওজন অনেক। আর তাঁর মতকে মেনে নিলে বোঝা যায়, নবপত্রিকা পুজোর মাধ্যমে আসলে আমাদের আদি মাতা পৃথিবীরই পুজো করি আমরা এবং সেই পুজো পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সঙ্গে মিলিয়েও নিই।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: এসে গেল শারদীয়া দুর্গাপুজো। বাঙালির জাতীয় উৎসব, সব থেকে বড় উৎসব! বৎসরান্তে আনন্দে মেতে ওঠার মহা-উপলক্ষ ও মহা-আয়োজন। এবার পুজোর প্রসঙ্গ উঠলেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে এবারের পুজোর নির্ঘণ্ট নিয়ে। ষষ্ঠী থেকে দশমী সাধারণত ৫ দিনের পুজো, এর মধ্যে ষষ্ঠীকে সেভাবে ধরা হয় না, সেই হিসেবে বাংলায় শারদীয়া দুর্গা পুজো ৪ দিনের। কিন্তু এবার সেটা আচমকাই ৫ দিনের (মানে, ৬ দিনের)! কীভাবে?
নবপত্রিকা/কলা বউ
প্রচলিত ভাষায়, নবপত্রিকার নাম কলা বউ। নবপত্রিকা স্নানের অর্থ কলা বউ স্নান। সপ্তমী পুজোর আগে একটি কলাগাছকে পুজো করে গঙ্গার পবিত্র জলে স্নান করানো হয়। শুধু কলাগাছ নয়। এতে থাকে আরও আট রকমের উদ্ভিদ। সব মিলিয়ে সেই গাছের গুচ্ছকে শাড়ি পরানো হয়। সপ্তমীর পুণ্য লগ্নে গঙ্গাতীরবর্তী ঘাটগুলিতে বা নদী-জলাশয়ের ঘাটে ঘাটে চলে এই নবপত্রিকা স্নান তথা কলা বউ স্নান। এটিই দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক শুরু। কিন্তু কী এই নবপত্রিকা? দুর্গাপুজোর সঙ্গে তার যোগাযোগ কী? কেনই-বা দুর্গাপুজোয় কিছু উদ্ভিদ-সংবলিত এক নারীপ্রতিম মূর্তির এই স্নান বা পুজোর নিয়ম চলে আসছে?
শস্যসংগ্রহের কাল
এই সব 'কেন'র উত্তর পেতে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। বহু বহু বছর আগে একটা সময় শরৎকালই ছিল শস্য সংগ্রহের, মানে যাকে আমরা 'হার্ভেস্ট' বলে থাকি, তার সময়কাল (বৃষ্টিপাতের প্যাটার্নের পরিবর্তন, ঋতুচক্রগত বদল, জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে এখন সেটা কিছুমাস পিছিয়ে অগ্রহায়ণে এসে ঠেকেছে)। তখন শরৎকালেই আমন ধান কাটা হত। আর মানুষ তখনও যেহেতু প্রকৃতিপুজোতেই অভ্যস্ত ছিল এবং মূর্তিপূজা সেভাবে জানতও না, তাই তারা শস্যসমৃদ্ধি প্রার্থনা করে এক লৌকিক দেবীর পুজো করত, বলা ভালো, সরাসরি প্রকৃতিরই পুজো করত। শস্যই যে সমৃদ্ধি (আর প্রকারান্তরে অন্নই যে ব্রহ্ম) এই ভাবনাই নিহিত সেই আচারে। তখনও শরতে বা আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়নি। তখনও বাসন্তীপুজোই ছিল দুর্গাপুজো।
শস্যের সঙ্গে দুর্গা-যোগ
অনাদি সময় থেকে সেই সময় (মোটামুটি চোদ্দো শতকের আগে, কেননা চোদ্দো শতকের শেষে বা পনেরো শতকের শুরুতেই আশ্বিনে নতুন করে দুর্গাপুজোর চল) পর্যন্ত সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে শস্য বা উদ্ভিদেরই পুজো করা হত। যা পরে শরতে দুর্গাপুজো শুরু হলে কোনও ভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ক্রমে দুর্গাপ্রতিমার পাশেই স্থান পান সেই উদ্ভিদ-দেবী, তথা নবপত্রিকা।
আদি মাতা পৃথিবীর পূজা
গবেষকদের মতেও নবপত্রিকার পুজো প্রকৃতপক্ষে শস্যদেবীরই পুজো। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, 'এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজা মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। ... বলা বাহুল্য এই সবই হইল পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সহিত এই শস্যদেবীকে সর্বাংশে মিলাইয়া লইবার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-দেবী মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপূজার ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পূজা অনেকখানি মিশিয়া আছে।' একটি নিরীহ 'বোধহয়' যোগ করে শশিভূষণ এই জরুরি ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন ঠিকই, তবে তাঁর মতো তন্নিষ্ঠ গবেষকের মন্তব্যকে কোনও রকম সংশয় ছাড়াই মান্যতা দিতে হয়। অর্থাৎ, বোঝা গেল, উদ্ভিদ বা নবপত্রিকাপুজোর মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের আদি মাতা পৃথিবীরই পুজো করি এবং সেই পুজো পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সঙ্গে মিলিয়েও নিই।
ন'টি প্রতীকশস্য
কী এই উদ্ভিদ-দেবী তথা নবপত্রিকা? কীসের পুজো সেই পুরাকালের মানুষ করতেন? সপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকায় যে ন'টি গাছকে স্নান করানো হয়, সেগুলি হল-- কলা গাছ, সাধারণ কচু, মানকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক এবং অবশ্যই ধান। এই ন'টি গাছ শস্যসমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন পুরাকালের মানুষ। তাঁরা হয়তো কিছু ভেবেচিন্তেই এই গাছগুলি নির্বাচন করেছিলেন। অথবা পরবর্তীকালে এতে কোনও পরিবর্তন ঘটে থাকতে পারে, যার কোনও তথ্য পরবর্তীকালে আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়নি।
তবে যেটা খুব ইন্টারেস্টিং, সেটা হল এই ন'টি গাছকেই দেবীত্বের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এটা খুবই বিতর্কিত। প্রথমত, যদি উপরোক্ত তথ্যই ইতিহাসসিদ্ধ হয়, তবে নিশ্চয়ই পরবর্তীকালে উক্ত উদ্ভিদসমূহের উপর দেবীত্বের আরোপ ঘটে থাকবে। আর যদি, অন্য মতে, দুর্গাপুজোর শাস্ত্রবিহিত আচারের মধ্যেই এটা বরাবর থেকে থাকে, তবে নবপত্রিকার মধ্যে আলাদা করে শস্যপুজোর কৃষিজীবী-সঞ্জাত উদযাপনের তত্ত্ব খোঁজাটা বাহুল্যই।
আপাতত, নবপত্রিকার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাটার দিকে চোখ রাখা যাক:
নবপত্রিকার ন'টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার ন'টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত।
কলা বা কদলী বা রম্ভা: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী ব্রহ্মাণী;
কচু (সাধারণ): এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিকা;
হলুদ বা হরিদ্রা: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী উমা;
জয়ন্তী: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী কার্তিকী;
বেল বা বিল্ব: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী শিবা;
ডালিম বা বেদানা বা দাড়িম্ব: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী রক্তদন্তিকা;
অশোক: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী শোকরহিতা;
মানকচু: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী চামুণ্ডা;
ধান: এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী;
এই ন'টি উদ্ভিদের শাখাপল্লবকে একত্রিত করে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে একে শাড়ি পরিয়ে গণেশের পাশে রেখে দুর্গাপুজোর চারদিন এঁর পুজো করা হয়। এই নয় দেবীকে একত্রে 'নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা' বলা হয়। ইনি 'নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ' মন্ত্রে পূজিতা হন।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)