জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ২০২৬ সালের শারদোৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির নজর এখন ২০২৮ সালের দিকে। চায়ের ঠেক থেকে সোশ্যাল মিডিয়া-- সর্বত্র এক অদ্ভুত আলোচনা। ২০২৮ সালে নাকি মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার দেবী দুর্গার বোধন ও পুজো হবে? শাস্ত্রের অঙ্কে এমন অদ্ভুত তিথি বিভ্রাটের (Tithi Discrepancy) জল্পনা ছড়িয়ে পড়তেই আলোড়ন তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষ ও গবেষকদের মধ্যে। কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে? এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই বা কী? কেন এই বিভ্রাটের আশঙ্কা? দুই পঞ্জিকার চিরন্তন টানাপোড়েনবাংলায় মূলত দুটি আলাদা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় গণনার ভিত্তিতে পঞ্জিকা (Bengali Almanac) প্রকাশিত হয়--
১. সূর্যসিদ্ধান্ত (Surya Siddhanta)
এটি প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। বাংলার সিংহভাগ বারোয়ারি ও বনেদি বাড়ির পুজো (Barowari & Household Pujas) এই মত অনুসারেই পরিচালিত হয়।
২. বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত বা দৃক সিদ্ধান্ত (Bisuddha Siddhanta / Drik Ganita)
এটি আধুনিক দূরবীন ও আধুনিক গণিতভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের (Modern Astronomical Calculation) ওপর প্রতিষ্ঠিত। হাওড়ার বেলুড় মঠ এবং রামকৃষ্ণ মিশনের (Ramakrishna Math & Mission) সমস্ত শাখায় এই পঞ্জিকা মেনেই দেবীর আরাধনা করা হয়। সৌরমাস এবং চান্দ্রমাসের হিসাব, মলমাস (Adhik Maas বা লিপ মান্থ) এবং তিথির ক্ষয় ও বৃদ্ধির কারণে মাঝে মাঝেই এই দুই পঞ্জিকার তিথিতে ১ দিনের ফারাক দেখা যায়।
কিন্তু ২০২৮ সালের ক্ষেত্রে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের জটিল বিন্যাসে এই দুই পদ্ধতির মধ্যে অন্তত ১৫ দিন বা এক পক্ষের ব্যবধান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
চার দশক আগের স্মৃতি
১৯৮০-তে ঠিক কী ঘটেছিল? ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, এই ধরনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নতুন নয়। চার দশকেরও বেশি আগে, ১৯৮০ সালে বাংলায় ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল। সেই বছর দুই পঞ্জিকার মধ্যে প্রায় এক মাসের বিরাট ফারাক হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, একটি পঞ্জিকা অনুসারে যখন মহালয়ার তর্পণ চলছে, অন্য মতে তখন দীপাবলি ও কালীপুজো। আবার এক মতে যখন বিজয়া দশমীর বিসর্জন হচ্ছে, অন্য মতে তখন দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনার প্রস্তুতি।
তারও আগে ১৯১৮ সালেও একই রকম গণনা বিভ্রাট নথিবদ্ধ হয়েছিল।
কিন্তু শাস্ত্রজ্ঞ ও পঞ্জিকা প্রকাশকদের ব্যাখ্যা কী?
এই পরিস্থিতি নিয়ে অযথা বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন শাস্ত্রবিশেষজ্ঞরা। সর্বভারতীয় প্রাচ্য বিদ্যা আকাদেমির অধ্যক্ষ জয়ন্ত কুশারীর মতে-- শাস্ত্রে এতে কোনও বিরোধ নেই এবং কোনও পুজোই ত্রুটিপূর্ণ নয়। শাস্ত্রের নিজস্ব নিয়মে দুটি মতই স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ভক্তরা চাইলে উভয় তিথিতেই দেবীর চরণে অঞ্জলি দিতে পারেন।
অন্যদিকে, গুপ্ত প্রেস ও অন্যান্য প্রধান পঞ্জিকা প্রকাশকদের দাবি-- এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কিছুটা তাড়াহুড়ো হবে। কারণ বর্তমানে ২০২৭ সালের পঞ্জিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এমনকি ২০২৭ সালেও তিথির কিছুটা অমিল রয়েছে (যেমন এক মতে দু’দিন অষ্টমী, অন্য মতে দু’দিন নবমী)। ফলে ২০২৮ সালের চূড়ান্ত রূপরেখা আরও কিছুটা সময় পর স্পষ্ট হবে।
স্কুল-কলেজের সরকারি ছুটি কবে হবে?
বাঙালির পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে পুজোর দীর্ঘ অবকাশ (State Festival Holidays)। যদি দু’বার পুজো হয়, তবে সরকার কোন সময়ে ছুটি ঘোষণা করবে?
প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও ১৯৮০ সালের নজির বলছে, তৎকালীন জ্যোতি বসু সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের আবেগ ও বারোয়ারি পুজোর ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিয়ে সূর্যসিদ্ধান্ত মত অনুযায়ী আশ্বিন মাসেই রাজ্যব্যাপী সরকারি ছুটি মঞ্জুর করেছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৮ সালেও সরকার সেই পুরনো প্রশাসনিক ঐতিহ্য বজায় রেখেই সিংহভাগ ক্লাবের বারোয়ারি পুজোর দিনক্ষণ অনুসারেই প্রধান ছুটি কার্যকর করবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)