Durga Puja 2026: প্রবাসের মাটিতে থেকেও শিকড়ের টান অমলিন। হাজার হাজার মাইল দূরে জার্মানির বুকে শরতের আগমন মানেই বাঙালির হৃদয়ে ঢাকের শব্দ, মায়ের আগমনের প্রতীক্ষা আর পরিচিত উৎসবের আবেগ। বাংলা থেকে দূরে থেকেও সেই চিরপরিচিত আবহকে আপন করে নিতে আবারও শারদোৎসবে মাততে চলেছে জার্মানির বাভারিয়া প্রদেশের ফ্রাঙ্কোনিয়া অঞ্চলের শহর এরলাঙ্গেন। প্রবাসী বাঙালিদের উদ্যোগে আয়োজিত দুর্গাভিলের এবার পা দিল ষষ্ঠ বর্ষে। এবছরের দুর্গাপুজো হয়ে উঠতে চলেছে ধর্মীয় ঐতিহ্য, শিল্পসাধনা, সংগীত, খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিক মিলনের এক বর্ণময় উৎসব।
বিদেশের বহু জায়গায় তৈরি প্রতিমা নিয়ে গিয়ে পুজোর আয়োজন করা হয়। কিন্তু দুর্গাভিলের সদস্যরা নিজেরাই প্রতিমা তৈরি করেন। এই কাজ তাঁদের কাছে নিছক শিল্পচর্চা নয়; এর সঙ্গে মিশে রয়েছে ভক্তি, নিষ্ঠা, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাঙালির শাস্ত্রসম্মত প্রতিমাশিল্পকে প্রবাসে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।
1/8
জার্মানির বুকে দুর্গাভিলের শারদোৎসব
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজোর নানা আয়োজনের পাশাপাশি থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের প্রতিযোগিতা, ভোগ, বিশেষ খাবারের স্টল এবং লাইভ মিউজিকের আসর। এবারের অন্যতম আকর্ষণ মলহার ব্যান্ডের সংগীত পরিবেশনা। পাশাপাশি মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস দত্ত ওরফে মার্কোর লাইভ কনসার্টও পুজোমণ্ডপে এক বিশেষ সংগীতময় পরিবেশ তৈরি করবে।
2/8
তিনটি পরিবার থেকে ছয় বছরের যাত্রা
দুর্গাভিলের পথচলা শুরু হয় ২০২১ সালে, করোনা অতিমারির কঠিন সময়ে। মাত্র তিনটি বাঙালি পরিবারের আড্ডা থেকে শুরু হয়েছিল দুর্গাভিলের যাত্রা। আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগ ছয় বছরের পথ অতিক্রম করে প্রবাসী বাঙালিদের একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিণত হয়েছে।
3/8
জার্মানির মাটিতে প্রতিমা নির্মাণ:
দুর্গাভিলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলির অন্যতম হল জার্মানির মাটিতে নিজেদের হাতে মায়ের প্রতিমা তৈরি করার ঐতিহ্য। এঁটেল মাটি, বেলে মাটি, গঙ্গামাটি, পূর্ণমাটি এবং স্থানীয় মাটি দিয়ে তৈরি করা হয় প্রতিমা। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হলেও শিল্পসাধনায় নিবেদিত দীপঙ্কর সরকার নিজের হাতে তৈরি করেন। প্রথম বছরে মায়ের প্রতিমার উচ্চতা ছিল প্রায় ৭० সেন্টিমিটার। ছয় বছরের যাত্রায় সেই প্রতিমা নির্মাণের পরিসর বেড়ে এখন প্রায় ২.৪ মিটারের একটি বৃহৎ সাবেকি প্রতিমায় পৌঁছেছে।
4/8
সাবেকি প্রতিমা, আধুনিক প্রযুক্তি ও মণ্ডপসজ্জার অভিনবত্ব
এবারের মণ্ডপসজ্জাতেও থাকছে নতুনত্বের ছোঁয়া। ঐতিহ্যবাহী প্রতিমার সঙ্গে আধুনিক আলোকপ্রযুক্তির মেলবন্ধনে মণ্ডপে তৈরি হবে এক বিশেষ আবহ। পরিকল্পিত আলোকসজ্জা, ছন্দময় আলোর পরিবর্তন এবং দৃশ্যপটের রূপান্তর দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরবে নতুন নতুন নান্দনিক অভিজ্ঞতা।
5/8
মলহার ব্যান্ড ও লাইভ কনসার্ট: পুজোমণ্ডপে নৃত্যে এবং সংগীতের বিশেষ আকর্ষণ
দুর্গাভিলের এবারের শারদোৎসবের অন্যতম বড় আকর্ষণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লাইভ মিউজিকের আসর। পুজোর আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে মলহার ব্যান্ড তাদের নিজস্ব দল নিয়ে সংগীত পরিবেশন করবে। ব্যান্ডের পরিবেশনা ঘিরে সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে রয়েছে উৎসাহ। এর পাশাপাশি বিশিষ্ঠ সঙ্গীত শিল্পী মহুয়া ব্যানার্জি এবং তাপস দত্ত (মার্কো) এর লাইভ কনসার্টও থাকছে পুজোমণ্ডপে।
6/8
ভোগের মেনুতে বাংলার স্বাদ
বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই ভোগ, খাওয়াদাওয়া এবং জমজমাট আড্ডা। দুর্গাভিলের পুজোতেও এই পরিচিত ঐতিহ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য আলাদা মেনু রাখা হয়েছে। ভোগের পাশাপাশি থাকছে সদস্যদের নিজেদের হাতে তৈরি ফুচকার স্টল। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কলকাতার স্বাদের ঝালমুড়ি অথবা পাপড়ি চাট। প্রবাসের মাটিতে এই পরিচিত খাবারের আয়োজন বাঙালির নস্টালজিয়াকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি স্থানীয় জার্মান ও অন্যান্য দেশের মানুষের কাছেও বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিকে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করবে।
7/8
শোভাযাত্রা ও প্রতীকী বিসর্জনের বিশেষ উদ্যোগ
দুর্গাভিলের এবারের পুজোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা হল পুজোর পর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং প্রতীকী বিসর্জনের আয়োজন। ঢাকের তালে শোভাযাত্রা এবং শেষে কৃত্রিম জলাধারে মায়ের প্রতীকী বিসর্জনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রবাসের মাটিতে বাংলার বিসর্জন-সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়ার এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলার বিসর্জন মানেই ঢাকের বাদ্যি, সিঁদুরখেলা, আবেগ এবং 'আসছে বছর আবার হবে' ধ্বনি। বিদেশের মাটিতে সেই পরিচিত পরিবেশের অনুভূতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে দুর্গাভিলে।
8/8
এক টুকরো বাংলা, সকলের জন্য
এই পুজোর প্রকৃত শক্তি শুধু প্রতিমা বা মণ্ডপে নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। কেউ প্রতিমা গড়ছেন, কেউ সাজসজ্জার কাজ করছেন, কেউ রান্না করছেন, কেউ অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন-প্রত্যেকের অবদান মিলে তৈরি হচ্ছে প্রবাসে এক টুকরো বাংলা। সব মিলিয়ে দুর্গাভিলের ষষ্ঠ বর্ষের দুর্গাপুজো ধর্মীয় ঐতিহ্য, শিল্প, সংগীত, খাদ্যসংস্কৃতি এবং সামাজিক মিলনের এক সম্মিলিত উদ্যাপন। বিদেশের মাটিতে থেকেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এই প্রচেষ্টা আগামী প্রজন্মের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মায়ের আগমনকে কেন্দ্র করে তাই আবারও একত্রিত হবে প্রবাসী বাঙালিরা-ভক্তি, আনন্দ, বন্ধুত্ব এবং শিকড়ের টানে।
লিখেছেন- সুপর্ণা সাউ ঘোষ