জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিধানসভা নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে বরাবরই ‘সেমিফাইনাল’ হিসেবে ধরা হয় বিধান পরিষদ অর্থাৎ এমএলসি (Member of Legislative Council - MLC) নির্বাচনকে। রাজ্যের মোট ১১টি শিক্ষক (Teachers' Constituency) ও স্নাতক (Graduates' Constituency) আসনের ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে চরম রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে যোগীরাজ্যে। লখনউ, বারাণসী, মেরঠ, আগ্রা, গোরক্ষপুর, ঝাঁসি এবং বরেলির মতো বড় কেন্দ্রগুলোতে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ের (Three-Tier Security) মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যালট পেপারের গণনা।
একদিকে নিজেদের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য ধরে রাখতে মরিয়া ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP), অন্যদিকে বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক মহলে ভর করে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে প্রস্তুত সমাজবাদী পার্টি (SP)।
বিরোধের কেন্দ্রে কোন আসনগুলো?
নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করে এই নির্বাচন। মূলত দুই শ্রেণির ভোটার অংশ নেন-- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার শিক্ষক এবং ন্যূনতম তিন বছর আগে ডিগ্রি সম্পন্ন করা গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক ভোটাররা।
৫টি স্নাতক আসন: লখনউ, বারাণসী, আগ্রা, মেরঠ এবং এলাহাবাদ-ঝাঁসি।
৬টি শিক্ষক আসন: লখনউ, আগ্রা, বারাণসী, মেরঠ, বেরেলি-মোরাদাবাদ এবং গোরক্ষপুর-ফৈজাবাদ।
এই আসনগুলো প্রথাগত দলভিত্তিক রাজনীতির চেয়ে কর্মচারী, শিক্ষক সমাজের সুযোগ-সুবিধা এবং মধ্যবিত্তের মেজাজ বুঝতে এক অন্যতম রাজনৈতিক ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে।
ইভিএম নয়, ব্যালট পেপার কিন্তু গণনা এত জটিল কেন?
সাধারণ বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে যেখানে ইভিএম (EVM) ব্যবহারের ফলে কয়েক ঘণ্টাতেই ছবি স্পষ্ট হয়ে যায়, সেখানে বিধান পরিষদ নির্বাচনে এখনও প্রচলিত ব্যালট পেপার (Ballot Paper) পদ্ধতি। ফলে গণনার গতি অত্যন্ত শ্লথ।
বান্ডিল তৈরি ও ছাঁটাই: প্রথমে সব ব্যালট বাক্স খুলে ভোটপত্রগুলি বের করে ৫০টি করে বান্ডিল (Bundling Process) তৈরি করা হয়। বাতিল বা অবৈধ ভোট আলাদা করা হয়।
অগ্রাধিকারমূলক ভোট (Preferential Voting System): ভোটাররা ব্যালটে প্রার্থীদের নামের পাশে ১, ২, ৩ ক্রম অনুযায়ী পছন্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন।
প্রথম পছন্দের ভোট ও কোটা নির্ধারণ: জয়ের জন্য প্রার্থীদের একটি নির্দিষ্ট ‘কোটা’ (Quota of Votes) অর্জন করতে হয়। প্রথম পছন্দের ভোটে কেউ কোটা না ছুঁলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের ভোট স্থানান্তর (Elimination and Transfer of Votes) করে গণনা চলতে থাকে। এই কারণেই চূড়ান্ত ফলাফল আসতে গভীর রাত বা পরের দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
গণনাকেন্দ্র ঘিরে সংঘাত ও বিরোধীদের কারচুপির অভিযোগ
ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই একাধিক কেন্দ্রে প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে সমাজবাদী পার্টি:
বক্সে বাড়তি ব্যালট পেপার: গোরক্ষপুর-ফৈজাবাদ কেন্দ্রে মউ-এর একটি বুথে ব্যালট বাক্সে ফর্ম ১৬-র তুলনায় ৫২টি বেশি ভোট মেলার অভিযোগ ঘিরে তুমুল হইচই তৈরি হয়।
এজেন্টদের প্রবেশে বাধা ও ডামি প্রার্থী বিতর্ক: ঝাঁসি ও আগ্রা কেন্দ্রে সমাজবাদী পার্টির পদপ্রার্থীদের গণনাকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ করা হয়, গেরুয়া উত্তরীয় পরা বিজেপি কর্মীরা ‘ডামি প্রার্থীর এজেন্ট’ হিসেবে ভেতরে ঢুকেছেন।
যদিও জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং অফিসাররা জানান, নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন মেনেই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ চলছে।
বরেলিতে বুথ দখলের অভিযোগ: বেরেলি-মোরাদাবাদ আসনে সপা ও বিজেপির প্রার্থীর মধ্যে বাকযুদ্ধ চরমে পৌঁছয়।
কেন এই ফল যোগী-অখিলেশ উভয়ের জন্যই অ্যাসিড টেস্ট?
উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদে (UP Legislative Council) বর্তমানে ১০০টি আসনের মধ্যে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র আসনসংখ্যা বিপুল। কিন্তু শিক্ষক ও স্নাতক আসনে জয় পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলির কাছে মর্যাদার লড়াই। বিজেপির দাবি, শিক্ষক ও কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর এবং নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের ডাবল-ইঞ্জিন সরকারের উন্নয়নের সুবাদেই তারা ঐতিহাসিক জয় পাবে।
অন্যদিকে, অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন সমাজবাদী পার্টি মনে করছে, পুরনো পেনশন প্রকল্প (Old Pension Scheme - OPS), কর্মসংস্থান এবং বেকারত্ব ইস্যুতে ক্ষুব্ধ শিক্ষক ও যুবসমাজ এবার ব্যালটে বিজেপিকে মোক্ষম জবাব দেবে। ব্যালটের এই রায় স্পষ্ট করবে, রাজ্যের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ে কার দিকে পাল্লা ভারী রাখছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)