জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: সাইবার দুনিয়ার জগতে শিশুদের সুরক্ষার অজুহাত দেখিয়ে কি তাদের হাত থেকে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া যায়? এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিতর্কে যুগান্তকারী রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। শনিবার সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) সাফ জানিয়ে দিয়েছে-- বয়সের কারণ দেখিয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে কোনও অবস্থাতেই ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা (Blanket Age-based Bans) চাপানো যাবে না।
সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (Article 21 - Protection of Life and Personal Liberty) এবং ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার (Article 19(1)(a) - Freedom of Speech and Expression) কথা বলে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে:
প্রাপ্তবয়স্কদের মতো শিশুদেরও তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মৌলিক অধিকার (Fundamental Right to Access and Use Internet) রয়েছে। আদালতের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ কী?
'আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা একে অপরের বিরোধী নয়। শিশুরা একই সঙ্গে দুটি অধিকারই পাওয়ার যোগ্য।'
কেন এই রায় দিল শীর্ষ আদালত?
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার মতো একাধিক দেশ যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং ভারতেরও কিছু রাজ্য একই ধরনের বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধের কথা ভাবছিল, সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়। শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, কোনও কিছু নিষিদ্ধ করে সমস্যার সমাধান করা যায় না। বরং প্রযুক্তিকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তোলাই রাষ্ট্র এবং ডিজিটাল মধ্যস্থতাকারীদের আসল দায়িত্ব।
বিচারপতিদের বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে:
ভিকটিমকেই দোষী ভাবা অন্যায়:
টেক প্ল্যাটফর্মগুলি যদি ক্ষতিকারক কনটেন্ট বা সাইবার অপরাধ রুখতে ব্যর্থ হয়, তবে তার দায়ে শিশুদের ইন্টারনেট বন্ধ করে শাস্তি দেওয়া যায় না। একে ‘ভুক্তভোগীকেই সমস্যা মনে করা’ (Mistaking the victim for the problem) বলে কড়া সমালোচনা করেছে আদালত।
কোনও অন্যায়ের স্বীকার হলে বলতে ভয় পাবে নাবালকরা:
বয়সের ভিত্তিতে কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিলে উল্টে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। সাইবার পরিসরে কোনও নাবালক যদি যৌন হেনস্থা, ব্ল্যাকমেল কিংবা মানসিক শোষণের (Online Sexual Abuse and Exploitation) শিকার হয়, তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার শাস্তি বা পরিবারের বকুনির ভয়ে সে পুলিস কিংবা অভিভাবককে জানাতেই ভয় পাবে। ফলে অপরাধীরা আরও বেশি সুবিধা পেয়ে যাবে।
শিক্ষা ও প্রান্তিক শিশুদের অধিকার:
একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা, তথ্য জানা ও সৃজনশীল মানসিক বিকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হল ইন্টারনেট। বিশেষ করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের (Children with Special Needs) সামাজিক যোগাযোগ ও বিকাশে নেট দুনিয়া অপরিহার্য। সব বয়সী বাচ্চা বা নাবালকদের ঢালাও ইন্টারনেট ব্যান হলে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।
টেক সংস্থা ও কেন্দ্রের জন্য সুপ্রিম গাইডলাইন
নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করলেও শিশুদের অনলাইন যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট (CSAM - Child Sexual Abuse Material) থেকে বাঁচাতে কেন্দ্র ও সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলোকে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা বেঁধে দিয়েছে শীর্ষ আদালত:
১. কেন্দ্রীয় ডাটাবেস গঠন: একাধিক সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম জুড়ে শিশু নিগ্রহের আপত্তিকর ডিজিটাল কনটেন্ট নিমেষে চিহ্নিত করতে এবং তা তৎক্ষণাৎ মুছে ফেলতে একটি স্বয়ংক্রিয় জাতীয় ডাটাবেস (National Database) গড়ে তুলতে হবে।
২. ‘চাইল্ড মোড’ ও সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ: মেটা (Meta), গুগল (Google)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলিকে শিশুদের অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে ডিফল্ট প্রাইভেট সেটিংস, অভিভাবকদের স্পষ্ট সম্মতি (Parental Consent) এবং অজানা প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি মেসেজ পাঠানোর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ-সহ ‘চাইল্ড মোড’ (Child Mode) চালু করতে হবে।
৩. ডিরেক্ট রিপোর্টিং ও আইটি নিয়ম বদল: হেনস্থার অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা (Direct Reporting Mechanism) আরও সহজ করতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারকে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও বিধিমালায় (IT Act and Rules) প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে একটি সার্বিক পরিচালন বিধি (SOP) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রকে এই পদক্ষেপের বিস্তারিত হলফনামা পেশ করতে হবে।
আদালত স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি বন্ধ করে সমাজে অন্ধকার তৈরি করা সমাধান নয়; আলো জ্বালিয়ে পথকে শিশুদের জন্য সুরক্ষিত রাখাই একবিংশ শতাব্দীর আসল ন্যায়বিচার।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)